"বন্দেমাতারম্" গানকে সাম্প্রতিককালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিদ্যালয় ও মাদ্রাসা গুলিতে বাধ্যতামূলক করেছে। অনেক রাষ্ট্রবাদী মুসলিম একে স্বাগত জানালেও, বেশ কিছু ধর্মান্ধ মুসলিম এর বিরোধিতা করে চলেছে। এদের মত হলো বন্দেমাতারম্ ইসলাম বিরুদ্ধ একটি সঙ্গীত। এরা স্বাধীনতার সময়কালে যে সব ছেঁদা যুক্তি বন্দেমাতারম্ এর বিরুদ্ধে তুলে ধরতো, আজও সেগুলি তুলে এর বিরোধিতায় নেমে পড়েছে। আসুন এদের ছেঁদা যুক্তি গুলি কতটা অসাড় ও অন্তসাড়শূন্য তা দেখে নেওয়া যাক।
![]() |
| বন্দেমাতারম্ নিয়ে মুসলিমদের অপযুক্তি খন্ডন |
(১.) বন্দেমাতারম্ এর বিরুদ্ধে এদের প্রথম অভিযোগ, এটি মাতৃবন্দনা বা মূর্তি পুজার গান। মুসলিমরা এক আল্লাহর উপাসনায় বিশ্বাসী। তাদের মতে, দেশকে মাতৃ রূপে বা দেবী রূপে বন্দনা করা মূর্তিপুজার সামিল এবং এটি একটি ইসলাম বিরুদ্ধ হারাম কাজ। সুতরাং তাদের মত হলো - মুসলিমরা, একমাত্র আল্লাহর বন্দনা বা উপাসনা করবে, কোন মাতৃবন্দনা করবে না।
মাতৃবন্দনার বিরুদ্ধে তাদের এই ছেঁদা যুক্তিকে অনায়াসে ছিন্ন ভিন্ন করে দেওয়া যায় প্রতিবেশী বাংলাদেশের উদাহরন তুলে ধরেই। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতটি লিখেছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মের অনুসারী ও অন্যতম জনপ্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতটি এরকম -
"আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি॥ ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,মরি হায়, হায় রে—ও মা, অঘ্রাণে তোর ভরা ক্ষেতে কী দেখেছি আমি মধুর হাসি॥"
এখানে লক্ষ্য করার বিষয়, বন্দেমাতারম্ এর মতো "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি" গানটিও একটি মাতৃবন্দনার গান। দেশকে জননী রূপে কল্পনা করে এখানে তার বন্দনা করা হয়েছে। ধর্মের ভিত্তিতে ভাগ হওয়া পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের মুসলমান জনগন যদি মাতৃবন্দনার গানকে জাতীয় সঙ্গীত রূপে গাইতে পারে তাহলে ভারতের মুসলমানদের বন্দেমাতারম্ গাইতে অসুবিধা কোথায়?
দুটি গানের ক্ষেত্রেই তো দেশকে মা বা জননী রূপে কল্পনা করে তার বন্দনা করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে, দেশকে জননী রূপে দেখা মানে, তা কখনই মূর্তিপুজার সমতুল্য নয়। বরং মাতৃরূপে দেশকে শ্রদ্ধা জানানো।
ইউরোপীয়রা তাদের দেশকে সর্বদাই "পিতৃভূমি" বলে আখ্যায়িত করতো। ঔপনিবেশিক আমলে ইংরেজরা ভারতীয় পুরুষদের ভীরু, দুর্বল, কাপুরুষ, হাতে চুড়ি পরিহিত, ইত্যাদি নানাবিধ অ - পৌরুষ বা নারী - অসম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত করতো। এর বিপরীতে ও প্রতিবাদে বঙ্কিমচন্দ্র, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা দেশকে পিতৃভূমির বদলে নারীসূচক - "জননী" রূপেই তুলে ধরেন। পরাধীন দেশে দেশকে "মাতৃরূপে" পরিবেশনে একদিকে যেমন বিমূর্ত জাতীয়তাবাদী ধারনাকে সর্বসমক্ষে অত্যন্ত সহজ, সরল ও মূর্ত ভাবে তুলে ধরা সম্ভব হয়, তেমনই দেশের জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নারী, পুরুষ নির্বিশেষে আপামোর ভারতবাসীকে পরাধীন দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচনেও উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব হয়।
যাইহোক, উপরোক্ত যুক্তিবাদী আলোচনার শেষে, যে সমস্ত মুসলিম এখনো বন্দেমাতারম্ গাইতে দ্বিধান্বিত, তাদের কাছে একটি প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, বাংলাদেশের মুসলমানরা এখনো নির্দ্ধিদায় তাদের জাতীয় সঙ্গীত গাইতে পারলেও, ভারতের মুসলিমদের বন্দেমাতারম্ গাইতে এখনো এত সঙ্কোচ, এত দ্বিধা, এত দ্বিচারিতা কেন? এর কোন যুক্তিসঙ্গত উত্তর আছে কি তাদের কাছে?
(2.) বন্দেমাতারম্ এর বিরুদ্ধে মুসলমানদের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো, বন্দেমাতারম্ গানে দেবী দুর্গা সহ অনেক হিন্দু দেবদেবীর বন্দনার কথা বলা আছে, যা ইসলাম বিরুদ্ধ। ইসলাম মূর্তি পুজার বিরোধিতার কথা বলে, আর বন্দেমাতারমে্ দেশকে দেবী রূপে তুলে ধরে তার মূর্তিপুজার কথা বলা হয়েছে। সুতরাং ইসলাম বিরুদ্ধ হওয়ায় মুসলমানরা কখনো বন্দেমাতারম্ গাইতে পারে না।
ভারতীয় মুসলমানদের এই ছেঁদা যুক্তিও যে কতটা অসাড় ও অন্তসাড়শূন্য তা নিন্মলিখিত দুটি দেশের উদাহরন দিয়ে খন্ডন করে দেওয়া যায়। হিন্দু দেবীর স্তুতি করলে বা তার নাম নিলে তা যে ইসলাম বিরুদ্ধ হয় না, তার সবথেকে বড়ো প্রমান রেখেছে আমাদের দুই প্রতিবেশী মুসলিম দেশ বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়া।
অবিভক্ত ভারতের জনপ্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মুসলমান হয়েও অসংখ্য, কৃষ্ণভজন ও শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন ও গেয়েছিলেন, তা সত্ত্বেও তিনি একটি মুসলিম দেশের (বাংলাদেশের) জাতীয় কবি হিসাবে ঘোষিত হন। এখন প্রশ্ন হলো, তাঁর ও সেই দেশের মুসলমানদের জাত ও ধর্ম কি এতে বিচ্যুতি হয়েছে? এর থেকেও বড়ো কথা, নজরুলের মতো একজন মুসলমান কবি যদি শ্যামাসঙ্গীত রচনা করে এবং তার সেই গান বাংলাদেশের হাজার হাজার মুসলমান গায় ও শোনে, তাহলে সেটিতে কি ইসলামের অবমাননা হয়? যদি হতো তাহলে মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে কখনই নজরুলকে জাতীয় কবি হিসাবে ঘোষনা করা হতো না বা তার গান গাওয়া হতো না।
আসলে নজরুলের শ্যামাসঙ্গীত গাইলে ইসলাম অবমাননা হয় না, আবার বন্দেমাতারম গাইলে হয় এটি মুসলিমদের একটি দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
অন্যদিকে, বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও, ইন্দোনেশিয়ার সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে আজও সযত্নে প্রবাহিত হচ্ছে হিন্দু সংস্কৃতির ধারা। ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতীক বিষ্ণুর বাহন গরুড়। সে দেশের মুদ্রায় আছে ভগবান গনেশের ছবি। রামায়ণ এবং মহাভারতের মতো হিন্দু মহাকাব্য ইন্দোনেশিয়ার শিল্প ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। হিন্দু দেবদেবী ও সংস্কৃতির চর্চাকে ইন্দোনেশিয়ার জনগন কখনই ইসলাম বিরুদ্ধ বলে মনে করে না, অথচ ভারতের মুসলমানরা বন্দেমাতারম্ গাওয়াকে মূর্তি পুজার সামিল ও ইসলাম বিরুদ্ধ বলে মনে করে। এটি ভারতীয় ইসলামের একটি চারিত্রিক দ্বিচারিতা ছাড়া আর কী?
(3.) বন্দেমাতারম্ গাওয়া যাবে না এর বিরুদ্ধে মুসলিমদের আপত্তির তৃতীয় যুক্তিতে বলা যায়, মুসলমানরা কোরানে যা উল্লেখিত আছে এবং যা নেই তাকেই ধ্রুবসত্য ও অবশ্য পালনীয় বলে মনে করে। এখন তাদের যুক্তিতেই শান দিয়ে বন্দেমাতারম্ না গাওয়ার তাদের যুক্তির বিরুদ্ধে আমরা পাল্টা বলতে পারি - কোরানে কি কোথাও লেখা আছে বন্দেমাতারম্ গাওয়া যাবে না? তা তো লেখা নেই। সুতরাং বন্দেমাতারম্ কোরান বিরুদ্ধ নয়, তাই মুসলিমদের বন্দেমাতারম্ না গাওয়ার সব যুক্তিই সর্বশেষে একটি কুযুক্তিতে পর্যবসিত হয়।
(4.) বন্দেমাতারম্ এর পক্ষে সর্বশেষ যে যুক্তিটি দেওয়া যায়, তা হলো দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের যুক্তি। বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই আনন্দমঠে বলেছিলেন - "দেশপ্রেমই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম"। (ক.) "গর্ভধারিণী" মা এবং (খ.) "প্রতিপালিকা ও ভূমিষ্ঠ রূপী" নিজ দেশ বা রাষ্ট্র - দুজনেই জননী স্বরূপ, নমস্য এবং পূজনীয়। ধর্মকে অতিক্রম করে ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে অবলম্বন করে পৃথিবীর সব দেশেই প্রবাহিত হয় জাতীয়তাবাদের ফল্গুধারা।
এখানে মনে রাখতে হবে, ইসলাম, আল্লাহ ও কোরআন একমাত্র এবং সার্বজনীন হলে, সব মুসলমানদের তো একটাই দেশ থাকতো অথবা সব মুসলমান মিলে একটি দেশেরই নির্মান করতো। দেশে দেশে মুসলমানরা তো এত বিভক্ত থাকতো না। এটি প্রমান করে ইসলামের চেয়েও সর্বশক্তিমান দেশ, রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদ। বন্দেমাতারম সেই জাতীয়তাবাদেরই গান। ধর্মীয় কারনে একসময় মুসলমানরা ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরি করলেও, বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে পুনঃরায় পাকিস্তান রাষ্ট্র দ্বিখণ্ডিত হয় এবং "বাংলাদেশ" নামে নতুন একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এক ইসলাম ও এক আল্লাহর উপাসনা করা সত্ত্বেও, পাকিস্তান ভেঙ্গে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম এবং পৃথিবীতে অনেক গুলি ইসলামিক দেশের অস্তিত্ব প্রমাণ করে এক আল্লাহ বা ইসলামের চেয়েও অধিক শক্তিমান জাতীয়তাবাদী আদর্শ। "বন্দেমাতারম্" সেই জাতীয়তাবাদেরই ভাবসঙ্গীত।
আসলে বন্দেমাতারম্ এর বিপক্ষে মুসলমানরা যত অপযুক্তি ও কুযুক্তিই পেশ করুক না কেন তাদের পেশ করা প্রতিটি যুক্তিই ইতিহাস ও কালের পর্যালোচনায় অত্যন্ত দুর্বল ও ছেঁদা।
![]() | |
|
সবশেষে আমাদের সকলকে মনে রাখতে হবে, মাতৃগর্ভজাত যে জাত মায়ের বন্দনা গাইতে সংকোচ বোধ করে সে জীবনের প্রথম বেইমানিটা মাকে দিয়েই শুরু করে। এরপর মির্জাফরের বেশে সে সারা দেশের সাথে বেইমানি করা শুরু করে। মাকে পাশে নিয়ে ঈশ্বরের সমীপে প্রার্থনা করতে যে জাত শিখে নি, সে জাত আর যাই হোক, কোনদিনই নিঃসঙ্কোচে "বন্দেমাতারম্" গাইতে পারবে না।

