বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় এবং প্রচলিত নানা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় তথ্য ভিত্তিক সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলীর ওপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এই প্রয়োজনকে সামনে রেখেই আজকের পর্বটিতে আমরা নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সম্পর্কিত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গুলিকে এখানে তুলে ধরলাম।
ইওরোপের ইতিহাস এমনিতেই ছাত্রছাত্রীদের কাছে একটু কঠিন মনে হয়। তার থেকেও তাদের কাছে কঠিন হলো ইতিহাসের তথ্য গুলিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে মনে রাখা। এই পর্বের মধ্য দিয়ে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সম্পর্কিত তথ্য গুলিকে এমন ভাবে সাজিয়ে তুলে ধরেছি, যাতে ছাত্রছাত্রীরা অনায়াসে তথ্য গুলিকে মনে রাখতে পারবে। এর পাশাপাশি আলোচ্য ইতিহাস সম্পর্কেও তাদের মনে একটি স্বচ্ছ ধারনা গড়ে উঠবে। ইতিহাসে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তথ্য মনে রাখার চেয়ে বিভিন্ন ছকের মাধ্যমে তথ্য মনে রাখা সবচেয়ে সহজ ও বিজ্ঞান সম্মত পদ্ধতি। আজকের আলোচনাটি সেইভাবেই সাজিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি।
একথা নিঃসন্দেহে বলতে পারি, আজকের পর্বটি থেকে কোন বিশেষ শ্রেনী নয়, বরং সকল শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীরাই উপকৃত হবে এবং তাদের প্রয়োজন মিটিয়ে নিতে পারবে।
![]() |
| নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য |
(১.) নেপোলিয়নের জন্ম :-
১৭৬৯ খ্রিঃ ১৫ ই আগস্ট, ভূমধ্যসাগরের কর্সিকা দ্বীপের অ্যাজাকসিও অঞ্চলে।
(২.) পিতার নাম :-
কার্লো বোনাপার্ট।
(৩.) মায়ের নাম :-
ল্যাটিজিয়া বোনাপার্ট।
(৪.) নেপোলিয়নের মৃত্যু :-
১৮২১ খ্রিঃ ৫ ই মে, সেন্ট হেলেনা দ্বীপে।
(৫.) নেপোলিয়নের যুগ :-
১৭৯৯ থেকে ১৮১৪ খ্রিঃ পর্যন্ত সময়কালকে ফ্রান্স ও ইওরোপের ইতিহাসে "নেপোলিয়নের যুগ" বলা হয়, কারন এই সময়কালে ইওরোপের রাজনীতির যাবতীয় ঘটনাপ্রবাহ ফ্রান্স ও নেপোলিয়নকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়।
(৬.) নেপোলিয়নের জীবনের সঙ্গে যুক্ত ৩ দ্বীপ :-
- (ক.) ভূমধ্যসাগরে অবস্থিত "কর্সিকা দ্বীপ" (নেপোলিয়নের জন্ম)।
- (খ.) ভূমধ্যসাগরে অবস্থিত "সেন্ট এলবা দ্বীপ" (জাতিসমূহের যুদ্ধের পর নেপোলিয়নকে ১৮১৪ খ্রিঃ এই দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়)।
- (গ.) দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত "সেন্ট হেলেনা দ্বীপ" ( জীবনের শেষ কটি দিন নেপোলিয়ন এই দ্বীপে নির্বাসিত জীবন কাটান এবং এখানেই ১৮২১ খ্রিঃ তাঁর মৃত্যু হয়।)
(৭.) নেপোলিয়নের বিভিন্ন উপাধি ও প্রবক্তাদের নাম :-
- (ক.) "নেপোলিয়ন বিপ্লবের সন্তান" - ঐতিহাসিক এইচ. এ. এল ফিশার বলেছিলেন।
- (খ.) "ফরাসি জাতির সম্রাট"- নেপোলিয়ন সম্রাট পদে অভিষিক্ত হবার পর ফরাসি আইনসভা এই উপাধি দিয়েছিলো।
- (গ.) "দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ান" - কোড নেপোলিয়ন প্রবর্তনের জন্য বলা হয়। ঐতিহাসিক ফিসার বলেছিলেন।
- (ঘ.) "বিপ্লবের ঝলসে ওঠা তরবারি" - যুদ্ধের মাধ্যমে ফরাসি বিপ্লবের আদর্শ সারা ইওরোপে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়।
- (ঙ.) "মধ্যযুগের শার্লেমান" - সামরিক রন - নিপুনতা ও যুদ্ধের মাধ্যমে রাজ্য জয়ের কৃতিত্বের জন্য বলা হয়।
- (চ.)" আধুনিক যুগের সিজার" - ইওরোপের বিভিন্ন জাতির মধ্যে জাতীয় ঐক্য চেতনার বিকাশের জন্য ঐতিহাসিক সলোমন এফ ব্লুম বলেছিলেন।
- (ছ.) "মুক্তির দূত" /"ত্রানকর্তা" - জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রসারের জন্য বলা হয়।
- (জ.) "মুকুটধারী জ্যাকোবিন" - ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন বলেছিলেন।
- (ঝ.)" মিশরের নায়ক" - পিরামিডের যুদ্ধে জয়লাভের জন্য বলা হয়।
(৮.) নেপোলিয়নের গুরুত্বপূর্ণ অসামরিক সংস্কার :-
- (ক.) ১৮০৪ খ্রিঃ "কোড নেপোলিয়ন" প্রবর্তন।
- (খ.) "লিজিয়ন অব অনার" প্রবর্তন (কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও দেশসেবার জন্য বিশেষ রাষ্ট্রীয় সম্মান।)
- (গ.) ১৮০০ খ্রিঃ "ব্যাংক অব ফ্রান্স" নামক কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা।
- (ঘ.) রাজস্ব বিভাগের কাজে তদারকির জন্য "আউট প্রথা" প্রচলন।
- (ঙ.) ১৮০৮ খ্রিঃ "ইউনিভার্সিটি অব ফ্রান্স" প্রতিষ্ঠা।
- (চ.) প্যারিসের "লুভের মিউজিয়াম" তৈরি।
(৯.) বিপ্লবী ফ্রান্সের বিরুদ্ধে গঠিত বিভিন্ন সময়ে ইওরোপের বিপ্লব বিরোধী দেশ গুলির শক্তিজোট :-
(ক.) ফ্রান্স বিরোধী প্রথম শক্তিজোট - ষোড়শ লুইয়ের মৃত্যুদন্ডের পর ১৭৯৩ খ্রিঃ ফ্রান্সের বিপ্লব বিরোধী রাজতান্ত্রিক প্রাশিয়া, অষ্ট্রিয়া, রাশিয়া, সার্ডিনিয়া, নেপলস, ইংল্যান্ড, হল্যান্ড, স্পেন, পোর্তুগাল প্রভৃতি দেশ গুলি "প্রথম শক্তিজোট" গঠন করে।
- ১৭৯৬ খ্রিঃ নেপোলিয়নের ইতালি ও অষ্ট্রিয়া আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম শক্তিজোট ভেঙ্গে যায় (১৭৯৬)।
(খ.) ফ্রান্স বিরোধী দ্বিতীয় শক্তিজোট - নেপোলিয়ন ইতালি ও সুইজারল্যান্ডে প্রজাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা গঠন করলে ইওরোপের ভীত রাজতান্ত্রিক দেশ গুলি ১৭৯৯ খ্রিঃ ফ্রান্স ও নেপোলিয়ন বিরোধী "দ্বিতীয় শক্তিজোট" গঠন করেছিলো।
- ফ্রান্সের কনসুলেটের শাসনকালে (নেপোলিয়নের শাসনকালে) অষ্ট্রিয়া, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, তুরস্ক প্রভৃতি দেশ গুলি দ্বিতীয় শক্তিজোট গঠন করেছিলো।
- ১৮০০ খ্রিঃ নেপোলিয়ন বিরোধী দ্বিতীয় শক্তিজোট ভেঙ্গে গিয়েছিলো।
(গ.) ফ্রান্স বিরোধী তৃতীয় শক্তিজোট - ১৮০৪ খ্রিঃ ইংল্যান্ড, রাশিয়া, অষ্ট্রিয়া, সুইডেন ও নেপলসকে নিয়ে গঠিত হয় "তৃতীয় শক্তিজোট"।
- তৃতীয় শক্তিজোট গঠনের উদ্দেশ্য ছিলো - নেপোলিয়নের প্রভাব থেকে ইওরোপকে মুক্ত করা ও ফ্রান্সকে তার প্রাক বিপ্লব যুগের সীমানায় ফিরে যেতে বাধ্য করা।
- ১৮০৫ খ্রিঃ অষ্টারলিজের যুদ্ধে নেপোলিয়ন অষ্ট্রিয়া ও রাশিয়াকে পরাজিত করলে নেপোলিয়ন বিরোধী তৃতীয় শক্তিজোটটি ভেঙ্গে যায়।
(ঘ.) ফ্রান্স বিরোধী চতুর্থ শক্তিজোট - ১৮১৩ খ্রিঃ নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে অষ্ট্রিয়া, প্রাশিয়া, রাশিয়া, সুইডেন ও ইংল্যান্ড চতুর্থ শক্তিজোট গঠন করেছিলো।
- চতুর্থ শক্তিজোটের সম্মিলিত বাহিনীর হাতেই ১৮১৩ খ্রিঃ "জাতিসমূহের /লিপজিগের যুদ্ধে নেপোলিয়নের চূড়ান্ত পতন ঘটে।
(১০.) নেপোলিয়নের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ ও সন্ধি :-
(ক.) ক্ষমতা লাভের আগে/ফ্রান্সের ডাইরেক্টরী শাসনকালে বিভিন্ন বৈদেশিক যুদ্ধ ও সন্ধি :-
- (1.) টলেনটিনোর সন্ধি (১৭৯৭) - নেপোলিয়ন পোপের রাজ্য মধ্য ইতালি আক্রমণ করলে ১৭৯৭ খ্রিঃ পোপ ষষ্ঠ পায়াস নেপোলিয়নের সঙ্গে "টলেনটিনোর সন্ধি" স্বাক্ষর করেন।
- (2.) ক্যাম্প - ফোর্মিও সন্ধি (১৭৯৭) - ১৭৯৭ খ্রিঃ নেপোলিয়ন অষ্ট্রিয়া আক্রমণ করলে অষ্ট্রিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রান্সিস নেপোলিয়নের সঙ্গে ১৭৯৭ খ্রিঃ ১৭ অক্টোবর, "ক্যাম্পো - ফোর্মিও সন্ধি" স্বাক্ষর করেন।
- (3.) পিরামিডের যুদ্ধ ও নীল নদের যুদ্ধ (১৭৯৮) - নেপোলিয়ন মিশর অভিযানকালে দুটি গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিলো - পিরামিডের যুদ্ধ ও নীলনদের যুদ্ধ।
- ১৭৯৮ খ্রিঃ নেপোলিয়ন ও ইংল্যান্ডের মধ্যে যুদ্ধ দুটি সংগঠিত হয়।
- পিরামিডের যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৭৯৮ খ্রিঃ ২১ শে জুলাই। এই যুদ্ধে নেপোলিয়ন জয়ী হন।
- নীল নদের যুদ্ধ হয় - ১৭৯৮ খ্রিঃ ১ - ৩ আগস্ট। এই যুদ্ধে নেপোলিয়ন ব্রিটিশ সেনাপতি হোরাটিও নেলসনের কাছে পরাজিত হন।
(খ.) ফ্রান্সে ক্ষমতা লাভের পর নেপোলিয়নের উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ ও সন্ধি :-
- (1.) কনকর্ডাক বা ধর্মমীমাংসা চুক্তি (১৮০১) - নেপোলিয়ন ১৮০১ খ্রিঃ যে চুক্তির মাধ্যমে পোপের সঙ্গে আপোস রফা স্থির করেন তা "Concordat নামে পরিচিত। ১৮০১ খ্রিঃ ক্যাথলিক পোপ সপ্তম পায়াস ও নেপোলিয়নের মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এখানে স্থির হয় - (ক.) পোপ ফরাসি গির্জার জাতীয়করন মেনে নেবে,(খ.) ক্যাথলিক ধর্মকে রাষ্ট্র মেনে নেবে এবং (গ.) রাষ্ট্র যাজকদের বেতন দেবে।
- (2.) লুনেভিলের সন্ধি (১৮০১) - ১৮০১ খ্রিঃ নেপোলিয়নের সঙ্গে অষ্ট্রিয়ার লুনেভিলের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। এই সন্ধিতে অষ্ট্রিয়া ক্যাম্পো - ফর্মিও সন্ধিকে পুনরায় মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলো।
- (3.) অ্যামিয়েন্সের সন্ধি (১৮০২) - ১৮০২ খ্রিঃ ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে অ্যামিয়েন্সের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়।
- (4.)ট্রাফালগারের নৌ যুদ্ধ (১৮০৫)- ১৮০৫ খ্রিঃ ইংল্যান্ড ও নেপোলিয়নের মধ্যে ট্রাফালগারের নৌ যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে নেপোলিয়ন ইংরেজ সেনাপতি নেলসনের কাছে পরাজিত হন।
- (4.) অস্টারলিজের যুদ্ধ (১৮০৫) - ১৮০৫ খ্রিঃ ২ ডিসেম্বর, তৃতীয় শক্তিজোটের দেশ অস্ট্রিয়া ও রাশিয়ার সঙ্গে নেপোলিয়নের অস্টারলিজের যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে নেপোলিয়ন জয়ী হন।
- (5.) প্রেসবার্গের সন্ধি(১৮০৫) - অস্টারলিজের যুদ্ধে পরাজয়ের পর ১৮০৫ খ্রিঃ ২৬ শে ডিসেম্বর, অস্ট্রিয়া নেপোলিয়নের সঙ্গে প্রেসবার্গের সন্ধি স্বাক্ষর করে।
- (6.) জেনার যুদ্ধ /স্কনব্রনের সন্ধি (১৮০৬) - ১৮০৬ খ্রিঃ প্রাশিয়ার সঙ্গে নেপোলিয়নের জেনার যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে প্রাশিয়া পরাজিত হয়ে নেপোলিয়নের সঙ্গে "স্কনব্রনের সন্ধি" স্বাক্ষর করে।
- (7.) ফ্রিডল্যান্ডের যুদ্ধ /টিলজিটের সন্ধি (১৮০৭) - ১৮০৭ খ্রিঃ নেপোলিয়ন ও রাশিয়ার মধ্যে ফ্রিডল্যান্ডের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়ে রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডার নেপোলিয়নের সঙ্গে ১৮০৭ খ্রিঃ ৮ ই জুলাই "টিলজিটের সন্ধি" স্বাক্ষর করে নেপোলিয়নের মহাদেশীয় ব্যবস্থা মেনে নিতে সম্মত হন।
- (8.) ফন্টেন ব্লুর সন্ধি(১৮০৭) - ১৮০৭ খ্রিঃ পোর্তুগাল মহাদেশীয় ব্যবস্থা না মানলে পোর্তুগাল আক্রমণের জন্য নেপোলিয়ন স্পেনের সঙ্গে গোপনে ১৮০৭ খ্রিঃ ফন্টেন ব্লুর সন্ধি স্বাক্ষর করে।
- (9.) এরফার্টের সন্ধি (১৮০৮) - ১৮০৮ খ্রিঃ নেপোলিয়নের সঙ্গে রাশিয়ার এরফার্টের সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়।
- (10.) পেনিনসুলার যুদ্ধ /উপদ্বীপের যুদ্ধ (১৮০৭ - ১৮১৪) - নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে স্পেন ও পোর্তুগালের সম্মিলিত যুদ্ধকে বলা হয় উপদ্বীপের যুদ্ধ। এই যুদ্ধ চলেছিলো ১৮০৭ - ১৮১৪ খ্রিঃ পর্যন্ত। এই যুদ্ধে ফরাসি বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে।
- (11.) উপদ্বীপের যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কিছু উল্লেখযোগ্য যুদ্ধের নাম - ভিক্টোরিয়ার যুদ্ধ, পিরেনিজের যুদ্ধ, স্যালামাঙ্কার যুদ্ধ। সবকটি যুদ্ধই হয়েছিলো ফ্রান্সের সঙ্গে স্পেনের এবং সবকটি যুদ্ধেই ফ্রান্স/নেপোলিয়ন পরাজিত হয়।
- (12.) মস্কো - ফ্রান্স যুদ্ধ (১৮১২) - রাশিয়া মহাদেশীয় ব্যবস্থা মানতে অস্বীকার করলে রাশিয়াকে শাস্তি দেওয়ার জন্য নেপোলিয়ন ১৮১২ খ্রিঃ রাশিয়া আক্রমণ করে।
- (13.) বোরোডিনোর যুদ্ধ (১৮১২) - ১৮১২ খ্রিঃ নেপোলিয়নের সঙ্গে রাশিয়ার বোরোডিনোর যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে নেপোলিয়ন জয়ী হন।
- (14.) জাতিসমূহের যুদ্ধ /লিপজিগের যুদ্ধ (১৮১৩) - ১৮১৩ খ্রিঃ নেপোলিয়নের সঙ্গে চতুর্থ শক্তিজোটের দেশগুলির (ইংল্যান্ড, প্রাশিয়া, রাশিয়া, অস্ট্রিয়া) সম্মিলিত বাহিনীর জাতিসমূহের যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধ জার্মানির লিপজিগে হয়েছিলো বলে একে লিপজিগের যুদ্ধও বলা হয়। আবার এই যুদ্ধে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ১৩ টি জাতি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো বলে একে "জাতিসমূহের যুদ্ধ" বলা হয়।
- (15.) ড্রেসডেনের যুদ্ধ (১৮১৩) - জাতিসমূহের যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে অনুষ্ঠিত এই যুদ্ধে (১৮১৩) নেপোলিয়ন অষ্ট্রিয়াকে পরাজিত করেন। ড্রেসডেনের যুদ্ধের জয়ই ছিলো নেপোলিয়নের শেষ উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ জয়।
- (16.) ফন্টেনব্লু সন্ধি (১৮১৪) - জাতিসমূহের যুদ্ধে পরাজিত নেপোলিয়ন বিজয়ী চতুর্থ শক্তিজোটের দেশগুলির সঙ্গে ফন্টেনব্লু সন্ধি স্বাক্ষর করেন। এই সন্ধি দ্বারা নেপোলিয়ন ফ্রান্সের সিংহাসন ত্যাগ করেন এবং তাকে বার্ষিক পেনশনের বন্দোবস্ত করে এলবা দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়।
- (17.) ওয়াটার্লুর যুদ্ধ(১৮১৫) - ১৮১৫ খ্রিঃ নেপোলিয়নের সঙ্গে ইংল্যান্ডের ওয়াটার্লুর যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এই যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাপতি ডিউক অব ওয়েলিংটন নেপোলিয়নকে চূড়ান্ত ভাবে পরাজিত করেন।
(১১.) নেপোলিয়ন ইংল্যান্ডের কাছে কোন কোন যুদ্ধে পরাজিত হন?
- (ক.) ১৭৯৮ খ্রিঃ নীল নদের যুদ্ধে (এই যুদ্ধে ইংরেজ সেনাপতি ছিলেন নেলসন)
- (খ.) ১৮০৫ খ্রিঃ ট্রাফালগারের নৌ যুদ্ধে, এবং
- (গ.) ১৮১৫ খ্রিঃ ওয়াটার্লুর যুদ্ধে, (এই যুদ্ধে ইংরেজ সেনাপতি ছিলেন ডিউক অব ওয়েলিংটন)।
(১২.) নেপোলিয়নের উল্লেখযোগ্য উক্তি:-
- "আমিই বিপ্লব",
- "আমি বিপ্লবকে ধ্বংস করেছি",
- "আমি সিংহাসন ত্যাগ করলাম, কিন্তু আমি কিছুই ছেড়ে গেলাম না" ( এলবা দ্বীপে নির্বাসিত হবার আগে এই উক্তি করেছিলেন।)
- "ইংল্যান্ড হলো দোকানদারের জাত"।
- "তুমি যদি মানুষের কথা শুনতে যাও, তাহলে তুমি কিছুই করতে পারবে না" (নিজ ভাই জেরমকে শাসন সংক্রান্ত বিষয়ে উপদেশ দিয়েছিলেন।)।
(১৩.) ফ্রান্সের বিভিন্ন শাসনকালের পরিচয় :-
- (ক.) ফরাসি বিপ্লবের যুগ - ১৭৮৯ খ্রিঃ - ১৭৯৯ খ্রিঃ।
- (খ.) ন্যাশনাল কনভেনশনের সময়কাল - ১৭৯২ - ১৭৯৫।
- (গ.) ডাইরেক্টরীর শাসনকাল - ১৭৯৫ - ১৭৯৯।
- (ঘ.) কনসুলেটের শাসনকাল - ১৭৯৯ - ১৮০৪।
- (ঙ.) নেপোলিয়নের শাসনকাল - ১৭৯৯ - ১৮১৪।
(১৪.) নেপোলিয়নের ক্ষমতা দখল / কনসুলেটের শাসন :-
- (ক.) নেপোলিয়ন ছিলেন ফ্রান্সের একজন সেনাপ্রধান ও জ্যাকোবিন দলের সদস্য।
- (খ.) ১৭৯৫ খ্রিঃ ৫ ই অক্টোবর, উগ্র রাজতন্ত্রের সমর্থকরা জাতীয় মহাসভা আক্রমন করলে নেপোলিয়ন তা প্রতিহত করেন। এই ঘটনাকে ফ্রান্সের ইতিহাসে বলা হয় "অক্টোবরের ঘটনা" বা "ভামেদিয়ার ঘটনা" বা "ত্রয়োদশ ভেন্ডামিয়ার"।
- (গ.) নেপোলিয়ন ডাইরেক্টরি শাসন উচ্ছেদ করে ক্ষমতা দখল করেন - ১৭৯৯ খ্রিঃ ৯ ই নভেম্বর।
- (ঘ.) নেপোলিয়নের ক্ষমতা দখলের দিনটি ছিলো বিপ্লবী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৮ ব্রুমেইয়ার (ইংরেজি ১৭৯৯ খ্রিঃ ৯ ই নভেম্বর) তাই ফ্রান্সের ইতিহাসে নেপোলিয়নের ক্ষমতা দখলের ঘটনাকে বলা হয় - "১৮ ব্রুমেইয়ারের ঘটনা"।
- (ঙ.) ফ্রান্সে নেপোলিয়নকে ক্ষমতা দখলে বিশেষভাবে সাহায্য করেন - ডাইরেক্টরি শাসকপ্রধান ব্যারন অ্যাবেসিয়েস।
- (চ.) ১৭৯৯ খ্রিঃ ৯ ই নভেম্বর, নেপোলিয়ন অ্যাবেসিয়াসের সাহায্যে ফ্রান্সে "কনসুলেটের সংবিধান /শাসন ব্যবস্থা" প্রবর্তন করেন। আবে সিয়েসের নেতৃত্বে গঠিত কনসুলেটের সংবিধানকে "অষ্টম বছরের সংবিধানও" বলা হয়ে থাকে।
- (ছ.) কনসুলেটের সংবিধান ১৭৯৯ - ১৮০৪ খ্রিঃ পর্যন্ত টিকে ছিলো।
- (জ.) কনসুলেটের শাসন ব্যবস্থায় ৩ জন কনসালের হাতে যাবতীয় শাসন ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয়। নেপোলিয়ন ছিলেন প্রথম কনসাল (১৭৯৯,২৪ ডিসেম্বর), দ্বিতীয় ও তৃতীয় কনসাল ছিলেন যথাক্রমে - অ্যাবেসিয়াস ও রোজার ডুকো।
- (ঝ.) কনসুলেটের শাসন ব্যবস্থায় নেপোলিয়ন প্রথমে ১০ বছরের জন্য কনসাল হিসাবে নিযুক্ত হন।
- (ঞ.) ১৮০২ খ্রিঃ সংবিধান সংশোধন করে নেপোলিয়নকে "যাবজ্জীবন কনসাল" করা হয়।
- (ট.) ১৮০৪ খ্রিঃ এক গন ভোটের ব্যবস্থা করে নেপোলিয়ন নিজেকে সম্রাট হিসাবে ঘোষনা করে উপাধি নেন - "ফরাসি জাতির সম্রাট"।
- (ঠ.) পোপ ষষ্ঠ পায়াস নেপোলিয়নকে নোতরদাম গির্জায় ইগলচিহ্নিত রাজমুকুট পরিয়ে ফরাসি সম্রাট পদে বরন করে নেন।
- (ড.) নেপোলিয়নের সম্রাটপদে বরন বা ঘটনাকে ফ্রান্সের ইতিহাসে বলা হয় - "প্রথম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা" ।
(১৫.) কোড নেপোলিয়ন সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য :-
- (ক.) ফ্রান্সে আইনগত ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার জন্য নেপোলিয়ন প্রবর্তন করেছিলেন - কোড নেপোলিয়ন।
- (খ.) ৪ জন ফরাসি আইনজীবীর ৪ বছরের প্রচেষ্টার ফলে (১৮০০ - ১৮০৪) ১৮০৪ খ্রিঃ ২১ মার্চ প্রবর্তিত হয় - "সিভিল কোড" (কোড নেপোলিয়নের পূর্বনাম) নামক আইনবিধি।
- (গ.) ১৮০৭ খ্রিঃ নেপোলিয়ন "সিভিল কোডের" নতুন নামকরন করেন - "কোড নেপোলিয়ন"।
- (ঘ.) কোড নেপোলিয়নে মোট ধারা ছিলো - ২,২৮৭ টি।
- (ঙ.) কোড নেপোলিয়নের আইন গুলিকে ৩ ভাগে ভাগ করা হয়েছিলো। যথা - দেওয়ানি আইন, ফৌজদারি আইন ও বানিজ্যিক আইন।
- (চ.) কোড নেপোলিয়নকে ঐতিহাসিক লেফেভর বলেছেন - "ফরাসি সমাজের বাইবেল"।
- (ছ.) কোড নেপোলিয়ন প্রবর্তনের জন্য নেপোলিয়নকে বলা হয় - "দ্বিতীয় জাস্টিনিয়ান"।
- (জ.) কোড নেপোলিয়নে রোমান আইনের ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিলো।
(১৬.) মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কিত তথ্য :-
- (ক.) সংজ্ঞা/মহাদেশীয় অবরোধ কাকে বলে? - ইওরোপীয় মহাদেশের সমস্ত বন্দর অবরোধ করে ইংল্যান্ডকে অর্থনৈতিক দিকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য নেপোলিয়ন কর্তৃক ঘোষিত বার্লিন ডিগ্রি, মিলান ডিগ্রি, ওয়ারশ ডিগ্রি ও ফন্টেনব্লু ডিগ্রি নীতি গুলিকেই একত্রে "মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা /কন্টিনেন্টাল সিস্টেম" বলে।
- (খ,) মহাদেশীয় ব্যবস্থার উদ্দেশ্য :- (1.) ইংল্যান্ডকে অর্থনৈতিক দিকে জব্দ বা শায়েস্তা করা, এবং (2.) ফ্রান্সের শিল্পের পুনরুজ্জীবন ঘটানো।
- (গ.) মহাদেশীয় ব্যবস্থার রূপায়ন :- (1.) ১৮০৬ খ্রিঃ নেপোলিয়ন কর্তৃক ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে "বার্লিন ডিগ্রি ঘোষনা", (2.) নেপোলিয়নের পাল্টা ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ইংল্যান্ডের ১৮১০ খ্রিঃ "অর্ডার ইন কাউন্সিল" ঘোষনা। (3.) ইংল্যান্ডের প্রত্যুত্তরে নেপোলিয়ন কর্তৃক মিলান ডিগ্রি, ওয়ারশ ডিগ্রি ও ফন্টেনব্লু ডিগ্রি জারি
- ফলাফল :- (1.) নেপোলিয়নের মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। (2.) অবরোধকে কঠোর ভাবে প্রয়োগ করতে গিয়ে নেপোলিয়ন বিভিন্ন দেশে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। (3.) তার আর্থিক ও সামরিক ক্ষতি হয়। (4.) অবরোধকে সফল করে তুলতে ফ্রান্সের যোগ্য শিল্প বা নৌবহর কিছুই ছিলো না।
(১৭.) নেপোলিয়ন কর্তৃক ইওরোপের পুনর্গঠন : গুরুত্বপূর্ণ তথ্য :-
- (ক.) নেপোলিয়ন ফ্রান্সের বাইরে যেসব দেশ দখল করেছিলেন সেই সব দেশ গুলিকে শাসনতান্ত্রিক ভাবে এমনকরে পুনর্গঠন করেন, যার ফলে ঐসব দেশ গুলিতে একদিকে যেমন ফরাসি বিপ্লবের ভাবধারা প্রসারিত হয়, তেমনি জাতীয়তাবোধ ও জাতীয় ঐক্যের চেতনাও জাগ্রত হয়।
- (খ.) নেপোলিয়ন সাম্রাজ্য বিস্তার করতে গিয়ে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যকে ভেঙ্গে দেন - ১৮০৬ খ্রিঃ।
- (গ.) তিনি ডাইরেক্টরি আমলে ইতালি অভিযান করে (১৭৯৬ - ৯৭) ইতালির মিলান ও লোম্বার্ডিকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন - "সিজালপাইন প্রজাতন্ত্র"।
- (ঘ.) জার্মানির ব্যাভেরিয়া, ব্যাডেন, উর্টেমবার্গ, স্যাক্সনী সহ ২৮ টি ছোট ছোট রাজ্যকে নিয়ে ১৮০৬ খ্রিঃ গঠন করেন - "কনফেডারেশন অব রাইন"।
- (ঙ.) অন্যদিকে জার্মানির হ্যানোভার, ব্রুনউইক, হেস প্রভৃতি রাজ্য গুলিকে নিয়ে গঠন করেন - "ওয়েস্টফেলিয়া রাজ্য"/" "কিংডম অব ওয়েস্টফেলিয়া"।
- (চ.) প্রাশিয়া অধিকৃত পোল্যান্ড ও রাশিয়ার কিছু অংশ নিয়ে গঠন করেন -" গ্রান্ড ডাচ অব ওয়ারশ"।
- (ছ.) নেপোলিয়নের জার্মানি পুনর্গঠনের ফলে জার্মানির রাষ্ট্র সংখ্যা ৩০০ থেকে কমে দাঁড়ায় ৩৯।
- (জ.) ইতালি, জার্মানি ছাড়া নেপোলিয়ন হল্যান্ডে "বাটাভিয়া প্রজাতন্ত্র" এবং সুইজারল্যান্ডে "হেলভেটিক প্রজাতন্ত্র" প্রতিষ্ঠা করেন।
(১৮.) ক্ষমতা ও স্বৈরাচারের জালে নেপোলিয়ন :-
(ক.) ফরাসি বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সের সমাজে যে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তার ফলে বংশ কৌলিন্য না থাকা সত্ত্বেও এবং একজন সাধারন ঘর থেকে জন্মলাভ করেও নেপোলিয়ন ফ্রান্সের শাসক হওয়ার সুযোগ লাভ করেছিলেন। শাসক হয়ে তিনি বিভিন্ন রাজ্য জয় করে সেখানে ফরাসি বিপ্লবের গনতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারা প্রসারিত করেন। এইজন্য নেপোলিয়নকে বলা হয় - "বিপ্লবের সন্তান"।
(খ.) কিন্তু ক্ষমতা লাভের অল্পকালের মধ্যেই নেপোলিয়ন নিজ ক্ষমতাকে "নিরঙ্কুশ" করে তুলতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহন করেন। ১৭৯৯ খ্রিঃ কনসুলেটের সংবিধানে তিনি "প্রধান কনসাল" হিসাবে ঘোষিত হন। এর অল্পকাল পরে ১৮০২ খ্রিঃ সংবিধান সংশোধন করে তিনি নিজেকে "যাবজ্জীবন কনসাল" এবং ১৮০৪ খ্রিঃ এক লোকদেখানো নির্বাচনের ব্যবস্থা করে নিজেকে "ফরাসি জাতির সম্রাট" বলে ঘোষনা করেন। ইতালি জয় করে নেপোলিয়ন নিজেকে "ইতালির রাজা" বলে ঘোষনা করেন। যে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিপ্লব হয়, নেপোলিয়ন ক্ষমতা লাভের পর সেই স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রকেই ফিরিয়ে আনেন। প্রশাসনে সর্বত্র নির্বাচনের বদলে মনোনয়নের নীতি গ্রহণ করেন। নিজ কর্মসূচি থেকে ফরাসি বিপ্লবের সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার মধ্যে স্বাধীনতার আদর্শটিকে বাদ দেন। ইওরোপের বিভিন্ন দেশে সাম্রাজ্যবাদী ও যুদ্ধ নীতি নিয়ে ভয় ও ত্রাসের পরিবেশ বজায় রাখেন। রাজতন্ত্রের ধারা মেনে ইওরোপের বিভিন্ন দেশে নিজ ভাই বংশধরদের স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেন। এইসব কারনে নেপোলিয়নকে বলা হয় - "বিপ্লবের ধ্বংসকারী"।
(গ.) রাজতন্ত্রের ধারা মেনে নেপোলিয়ন ইওরোপের যেসব দেশের সিংহাসনে তার ভাই ও পুত্রদের বসান -
- হল্যান্ডের সিংহাসনে বসান - ভাই লুইকে।
- ওয়েস্টফেলিয়া রাজ্যের সিংহাসনে বসান - ভাই জেরোমকে।
- ইতালির ভাইসরয় রূপে নিযুক্ত করেন - নেপোলিয়নের সৎপুত্র ইউজিনকে।
- নেপলসের সিংহাসনে বসান - ভাই যোশেফ বোনাপার্টকে, এবং পরে আরেক পুত্র মুরাকে।
- স্পেন দখলের পর স্পেনের সিংহাসনে বসান - ভাই যোশেফ বোনাপার্টকে।
(১৯.) নেপোলিয়নের পতন : গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- (ক.) নেপোলিয়নের পতনে ইংল্যান্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলো।
- (খ.) নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ইওরোপের রাজতান্ত্রিক দেশ গুলিকে শক্তিজোটে সংঘবদ্ধ করতে ইংল্যান্ড বারংবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলো।
- (গ.) নেপোলিয়ন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১৭৯৮ খ্রিঃ নীলনদের যুদ্ধে এবং ১৮০৫ খ্রিঃ ট্রাফালগারের নৌ যুদ্ধে শোচনীয় ভাবে পরাজিত হবার পর ইংল্যান্ডকে অর্থনৈতিক দিকে বিপর্যস্ত করার জন্য ১৮০৬ খ্রিঃ সারা ইওরোপীয় মহাদেশ জুড়ে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে "মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা" জারি করেন।
- (ঘ.) মহাদেশীয় ব্যবস্থাকে বলপূর্বক ভাবে কার্যকর করতে গিয়ে নেপোলিয়ন একের পর এক দেশে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।
- (ঙ.) যুদ্ধ করতে গিয়ে নেপোলিয়ন ফ্রান্সে করভার বহুগুন বৃদ্ধি করেন। ফলে দেশে তার জনপ্রিয়তা ও গ্রহনযোগ্যতা অনেকখানি হ্রাস পায়। জনগনের মনে নেপোলিয়ন বিরোধী ক্ষোভের সঞ্চার হয়।
- (চ.) ইংল্যান্ডের বন্ধুদেশ পোর্তুগাল মহাদেশীয় ব্যবস্থা মানতে অসম্মত হলে পোর্তুগালকে শাস্তি দিতে গিয়ে নেপোলিয়ন স্পেন - পোর্তুগালের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী উপদ্বীপের যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।
- (ছ.) উপদ্বীপের যুদ্ধে নেপোলিয়নের শোচনীয় বিপর্যয় ও পরাজয় একদিকে যেমন তার অপরাজেয় ভাবমূর্তিতে আঘাত হানে তেমনি তার বিরোধী দেশ গুলিকেও প্রবলভাবে উৎসাহিত করে। এর ফলশ্রুতিতে ঐসব দেশ নেপোলিয়ন বিরোধী চতুর্থ শক্তিজোটে সম্মিলিত হয়।
- (জ.) ১৮১২ খ্রিঃ রাশিয়া মহাদেশীয় ব্যবস্থা মানতে অসম্মত হলে নেপোলিয়ন রাশিয়াকে শাস্তি দিতে গিয়ে তাঁর বিখ্যাত "গ্রান্ড আর্মি" হারিয়ে ফেলে সামরিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়েন।
- (ঝ.) এই প্রেক্ষাপটে চতুর্থ শক্তিজোটের দেশ গুলি সম্মিলিত ভাবে ১৮১৩ খ্রিঃ নেপোলিয়নকে আক্রমণ করে শুরু করে "জাতিসমূহের /লিপজিগের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে নেপোলিয়ন ফ্রান্সের সিংহাসন হারান। তাকে এলবা দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়।
- (ঞ.) নেপোলিয়নের পতনে উল্লেখিত ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম ছাড়াও নেপোলিয়নের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও অহংকারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলো।
(২০.) একশ দিনের রাজত্ব : গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- (ক.) জাতিসমূহের যুদ্ধের পর নেপোলিয়নকে ফন্টেনব্লু সন্ধি (১৮১৪) অনুযায়ী ভূমধ্যসাগরের এলবা দ্বীপে নির্বাসনে পাঠানো হয়।
- (খ.) নেপোলিয়ন ফ্রান্সের সিংহাসন ত্যাগ করার পর বুরবোঁ রাজবংশের অষ্টাদশ লুইকে ফ্রান্সের সিংহাসনে বসানো হয়।
- (গ.) নেপোলিয়নের পতনে এবং বুরবোঁ রাজবংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ও দেশত্যাগী অভিজাতরা (ইমিগ্রী) প্রবল ভাবে উৎসাহী হয়ে ওঠে। তারা ফ্রান্সে ফিরে এলে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি হলে নেপোলিয়ন পুনরায় ১৮১৫ খ্রিঃ এলবা দ্বীপ থেকে ফিরে এসে প্যারিসে প্রবেশ করেন এবং ২০ মার্চ থেকে ২৯ জুন প্রায় ১০০ দিন ফ্রান্স শাসন করেন। একে "একশ দিনের রাজত্ব" বলা হয়।
(২১.) নেপোলিয়নের চূড়ান্ত পতন ও মৃত্যু :-
- (ক.) একশ দিনের রাজত্বের অব্যবহিত পর নেপোলিয়নের চূড়ান্ত পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয় ইংল্যান্ড।
- (খ.) ১৮১৫ খ্রিঃ নেপোলিয়নের সঙ্গে ইংল্যান্ডের ওয়াটার্লুর যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এই যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাপতি ডিউক অব ওয়েলিংটন নেপোলিয়নকে চূড়ান্ত ভাবে পরাজিত করেন।
- (গ.) ওয়াটার্লুর যুদ্ধের পর (১৮১৫) নেপোলিয়নকে "বেলরোফোন" নামক জাহাজে করে দক্ষিন আটলান্টিক মহাসাগরের সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়।
- (ঘ.) সেন্ট হেলেনা দ্বীপে কয়েক বছর পর কর্কট (ক্যান্সার) রোগে ১৮২১ খ্রিঃ ৫ ই মে মাত্র ৫২ বছর বয়সে নেপোলিয়নের মৃত্যু হয়।
(২২.) অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য :-
- "ওয়ার অ্যান্ড পিস" গ্রন্থটির লেখক হলেন - লিও টলস্টয়।
- নেপোলিয়নের সেনাদলের নাম ছিলো - গ্রান্ড আর্মি বা মহতী সেনাদল।
- ১৮১২ খ্রিঃ নেপোলিয়ন রাশিয়া আক্রমণ করলে রাশিয়া যে রননীতি গ্রহন করেছিলো, তার নাম ছিলো - "পোড়ামাটি নীতি।
- পোড়ামাটি নীতি বলতে বোঝায় - সরাসরি বা মুখোমুখি যুদ্ধ না করে শত্রুপক্ষ যাতে সামনে অগ্রসর হতে না পারে, সেইজন্য সব রাস্তাঘাট ও খাদ্যভান্ডার জ্বালিয়ে বা ধ্বংস করে শত্রুপক্ষকে বিপর্যস্ত করে তোলার রননীতি।
- কুটুজফ ছিলেন - রুশ সেনাপ্রধান, যিনি নেপোলিয়নের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পোড়ামাটি নীতি গ্রহন করেছিলেন।
- "ইউরোপ সিন্স নেপোলিয়ন" গ্রন্থটির লেখক ছিলেন - ডেভিড টমসন।
- উপদ্বীপের যুদ্ধে ইংরেজ সেনাপতি ছিলেন - ওয়েলিংটন।
