মধ্যযুগে পাঞ্জাবে ভক্তিবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সন্ত ছিলেন গুরু নানক (১৪৬৮/৬৯ - ১৫৩৮/৩৯ খ্রিঃ)। তিনি ছিলেন শিখদের প্রথম গুরু এবং "শিখ" ধর্মের প্রবক্তা। নানক দিল্লির লোদী বংশের সুলতান সিকান্দর লোদীর সমসাময়িক ছিলেন। সিকান্দর লোদী (প্রকৃত নাম ছিলো নিজাম শাহ খান। "সিকান্দর শাহ" উপাধি নিয়ে তিনি দিল্লির সিংহাসনে বসেছিলেন।) ১৪৮৯ খ্রিঃ থেকে ১৫১৭ পর্যন্ত দিল্লির সুলতান ছিলেন।
গুরু নানক বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি শিখ ধর্মের প্রচারের উদ্দেশ্যে শুধু ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানই নয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও পরিভ্রমন করেছিলেন। আফগানিস্তানে তিনি "নানক পীর" নামে পরিচিত ছিলেন। নেপালে তাকে "নানক ঋষি" নামে ডাকা হতো। আবার ইরাকে তিনি "বাবা নানক", শ্রীলঙ্কাতে "নানকাচার্য" এবং তিব্বতে "নানক লামা",সিকিম ও ভুটানে "গুরু রিংপোচে" এবং আরবদেশে "ভালি হিন্দি" নামেও পরিচিত ছিলেন।
![]() |
| ভক্তিবাদী সন্ত - নানক |
(১.) নানক পূর্ববর্তী পাঞ্জাবের পরিচয় :-
ভারতবর্ষের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজ্য ছিলো পাঞ্জাব। চতুর্দশ শতাব্দীতে আগত পর্যটক ইবন বতুতার রচনাতেই ঐতিহাসিকগত ভাবে পাঞ্জাব শব্দটির সর্বপ্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। শিখ ধর্ম প্রবর্তনের আগে পাঞ্জাব মূলত একটি হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল ছিলো। ভারতের পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত হওয়ায় পাঞ্জাবের পথ বেয়েই যেমন একের পর এক মুসলিম আক্রমনকারী সেনাদল ভারতে প্রবেশ করেছিলো, ঠিক তেমনই মুসলিম সংস্কৃতিও এই অঞ্চলে প্রবেশ করেছিলো। পঞ্চদশ শতকে ভক্তিবাদী আন্দোলনের পূর্বে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের থেকে পাঞ্জাবের চিত্রটি তাই অনেকাংশেই ভিন্ন ছিলো।
ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বহু পূর্বেই পাঞ্জাবে স্থায়ীভাবে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। প্রাক্ মধ্যযুগ থেকেই পাঞ্জাবের বিভিন্ন নগর ও গ্রামাঞ্চল গুলিতে বহু মুসলিম সন্ত ও ফকির ঘুরে বেড়াতেন। সেখানকার মানুষদের মুখে মুখে বাবা ফরিদ, আলাউল হক, জালালউদ্দিন বুখারি, মাখদুম জাহানিয়ান ও শেখ ইসমাইল বুখারির মতন সুফি সন্তদের নাম ঘুরে বেড়াতো। সুফি সাধকদের প্রচারের ফলে পাঞ্জাব অঞ্চল অঞ্চল ধর্মীয়, সংস্কৃতি ও বৌদ্ধিক সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে পরিনত হয়েছিলো।
এই উদারনৈতিক ধর্মীয় বাতাবরনের পাশাপাশি পাঞ্জাবে হিন্দু সমাজের রক্ষনশীলতাও ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে অনেক বেশি ছিলো। বৈদেশিক আক্রমনের জন্য ব্রাহ্মন্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার কঠোরতা ও অনুশাসন পাঞ্জাবে সবথেকে বেশি পীড়াদায়ক ছিলো। এখানে জাতপাতের তীব্রতা ছিলো বেশি। হিন্দু সমাজের বিশুদ্ধতা রক্ষা করার জন্য এখানে ব্রাহ্মনরা বর্নপ্রথার কঠোরতায় অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। এর ফলে পাঞ্জাবে নিন্মবর্নীয় ও অবর্নীয় মানুষেরা ভয়ঙ্কর সামাজিক নির্যাতনের শিকার হয়। এক বর্নের মানুষের সঙ্গে অপর বর্নের মেলামেশা এখানে নিষিদ্ধ ছিলো। উচ্চবর্নের মানুষ নিন্মবর্নের মানুষদের সঙ্গে একসঙ্গে বাস করতেন না, এমনকি একসঙ্গে খাদ্য গ্রহনকেও তাঁরা জাতিগত অপমান বলে মনে করতেন। তাই বাড়িতে বা যুদ্ধক্ষেত্রে মৃতদের শেষকৃত্য ও পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম একই বর্নের সদস্যদের দ্বারাই সম্পন্ন হতো।
পাঞ্জাবের সমাজব্যবস্থার এই কঠোরতা গুরু নানককে এতটাই প্রভাবিত করেছিলো যে, তিনি অন্যান্য ভক্তিবাদী সন্তদের মতো জাতপাতের বিরুদ্ধতাকে শুধু তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেই আবদ্ধ রাখেন নি। জাতপাত দূর করবার জন্য তিনি লঙ্গরখানা স্থাপন, একত্রে পঙ্কতিভোজন ইত্যাদি নানাবিধ কর্মসূচিও প্রবর্তন করেছিলেন। আসলে ভক্তিবাদ পূর্ব পাঞ্জাবের অবস্থা গুরু নানকের ধর্ম আন্দোলনকে বহুবিধ ভাবে প্রভাবিত করেছিলো। এই অঞ্চলে (ক.) ইসলামের ঐক্যবোধ, (খ.) সুফিবাদের উদারতা এবং (গ.) উপনিষদের আধ্যাত্মবোধ - এই তিনের সংমিশ্রনের মধ্য দিয়ে নানক ধর্মীয় পুনরুজ্জাগরন ঘটানোর উদ্দেশ্যে ভক্তিবাদী আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর মত ও পথকে অবলম্বন করেই পরবর্তীকালে পাঞ্জাব অঞ্চলে "শিখ" নামে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি ও ধর্মের উদ্ভব ঘটেছিলো।
(২.) নানকের সংক্ষিপ্ত জীবনী :-
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় :-
"জনমসখী" গ্রন্থ থেকে নানকের জীবনী সম্পর্কে নানা তথ্য পাওয়া যায়। ১৪৬৯ খ্রিঃ পাঞ্জাবের অন্তর্গত লাহোর জেলায় রাভি/ইরাবতী নদীর তীরে তালবন্দি নামে একটি ছোট্ট গ্রামে কার্তিক পূর্নিমা তিথিতে নানক জন্মগ্রহন করেন। তাঁর জন্মস্থানটি বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের অন্তর্গত এবং তালবন্দি গ্রামটি "নানকানা সাহিব" নামে পরিচিত।
নানক এক বেদী ক্ষত্রিয় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিলো মেহতা কল্যান দাস বেদী, যিনি মেহতা কালু চাঁদ বা কালু বেদী নামেও পরিচিত ছিলেন। নানকের মায়ের নাম ছিলো তৃপ্তা দেবী। নানকের পিতা স্থানীয় মুসলিম জমিদার রায় বুল্লারের অধীনে পাটোয়ারি বা জমি ও রাজস্ব সংক্রান্ত হিসাব পরিক্ষকের কাজ করতেন।
শিক্ষা গ্রহণ ও কর্মজীবন :-
নানক হিন্দু - মুসলিম উভয় শিক্ষকের কাছ থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। (ক.) সাত বছর বয়সে নানক গোপাল পান্থারের কাছে হিন্দি ভাষা শিখেন। (গ.) এর কয়েকদিন পর নানক বৈদ্যনাথ পন্ডিত মতান্তরে বৃজনাথ পন্ডিতের কাছে সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করেন। (ঘ.) অতঃপর মোল্লা কুতুবউদ্দিনের কাছে তিনি ফারসি ভাষা শেখেন।
বিদ্যা শিক্ষা সম্পূর্ন করার পর দিদির সূত্র ধরে সুলতানপুরের নবাব দৌলত খান লোদীর অধীনে চাকুরি নেন। সেখানে ১৪৯৯ খ্রিঃ পর্যন্ত নানক ছিলেন। এই সময় নানক তাঁর বেতনের সিংহভাগ অর্থই গরিব দুঃখিদের সেবায় ব্যায় করে দিতেন। ১৮ বছর বয়সে নানক গুরুদাসপুরের সুলখনা চৌনীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। শ্রীচাঁদ ও লক্ষী দাস (মতান্তরে লক্ষী চাঁদ) নামে নানকের দুজন পুত্রের জন্ম হয়। কিছুদিন সংসারধর্ম পালন করার পর নানকের দিব্য উপলব্ধি হয়। এইসময় প্রিয় শিষ্য মর্দনকে সঙ্গে নিয়ে নানক সত্যানুসন্ধানের জন্য গৃহত্যাগ করেন।
নানকের গৃহত্যাগ :-
৩০ বছর বয়সে নানক চাকুরি ও গৃহত্যাগ করে ফকির হয়ে যান। এরপর নানান দেশ ভ্রমন করে তিনি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেন। নানকের রচিত একটি শ্লোক থেকে জানা যায়, খ্রিঃ ষোড়শ শতকের প্রথমদিকে আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য নানক দীর্ঘকালব্যাপী "উদাসী যাত্রা" করেছিলেন।
এইসময় তিনি "নৌ - খন্ড" অর্থাৎ পৃথিবীর নয়টি অঞ্চলের বেশকিছু স্থান পরিভ্রমন করেন। তিনি উত্তরদিকে কাশ্মীর, হিমালয় ও নেপাল পরিভ্রমন করেন। পূর্বদিকে সিকিম, আসাম ও বঙ্গদেশ ভ্রমন করেন। দক্ষিনে সিংহল এবং পশ্চিমে আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক ও আরব পরিভ্রমন করেন। অবশেষে তিনি ইরাবতি নদীর তীরে লাহোরের কাছে বর্তমান পাকিস্তানের অন্তর্গত করতারপুরে এসে বসতি স্থাপন করেন। পরে এই অঞ্চলেই ১৫৩৯ খ্রিঃ তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে নানক পাঞ্জাবে তাঁর ভক্তিবাদী শিখ ধর্ম প্রচার করেন এবং খ্যাতিলাভ করেন। হিন্দু - মুসলিম নির্বিশেষে বহু মানুষ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহন করে।
(৩.) নানকের ধর্মীয় মতবাদ :-
নানক উপনিষদের একেশ্বরবাদকে সহজ - সরল ও সাবলীল ভাষায় প্রচার করেন। তাঁর ধর্মীয় মতবাদের মূল দিক গুলিকে আমরা নিন্মলিখিত ভাবে তুলে ধরতে পারি।
(ক.) নির্গুন তত্ত্বের প্রচার :-
নানক তাঁর ধর্মমতের মধ্য দিয়ে নির্গুন তত্ত্বের প্রচার করেন। যে ভক্তিবাদী সাধকগন ঈশ্বরের নিরাকার রূপে বিশ্বাসী এবং যাবতীয় রক্ষনশীলতা ও জাতিভেদ প্রথার বিরোধী ছিলেন, তাদেরকেই সাধারনত "নির্গুন সম্প্রদায়" বলা হয়। নানকের মতে, ঈশ্বর হলো এক এবং আদ্বিতীয়। তাঁর কোন আকার, বর্ন ও লিঙ্গ নেই।
(খ.) ঈশ্বর সম্পর্কে মত :-
নানক নির্গুন তত্ত্বের সাধক ছিলেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই তিনি ঈশ্বরের মূর্তি পুজার বিরোধী ছিলেন। তাঁর দৃষ্টিতে ঈশ্বর অনুভূতি ছিলো দুই রকমের। প্রথমত, সেই ঈশ্বর যাঁর আকৃতি জানা যায় না। দ্বিতীয়ত, সেই ঈশ্বর, যিনি "অকাল" অর্থাৎ অনন্ত, "নিরঙ্কার" অর্থাৎ নিরাকার, "অলখ" অর্থাৎ যাঁকে ভাষায় বর্ননা করা যায় না এবং যিনি "সর বিপাক" অর্থাৎ সর্বত্র বিচরনশীল বা সর্বভূতে বিরাজমান।
(গ.) আচার অনুষ্ঠানের বিরোধিতা :-
নানক বলেন, মানুষ প্রকৃতিগত ভাবে অন্ধ। সে মুক্তি পেতে চায়, ঈশ্বরের কৃপা পেতে চায়, কিন্তু সঠিক পথ না জানায় সে অন্ধের মতো পথভ্রষ্ট হয়ে এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায়। হিন্দুরা মন্দিরে এবং মুসলমানরা মসজিদে তাদের ঈশ্বরকে খুঁজে ফেরার জন্য ছুটে যায়। তারা জানেই না যে, বাহ্যিক আচরনসর্বস্ব এই সাধনার মধ্য দিয়ে কখনই মুক্তিলাভ সম্ভব নয়। তাই তারা জন্মান্তরের পাকেই আবদ্ধ এবং পৃথিবীতে আসে দুঃখ ভোগ করার জন্য। একেই নানক বলেছেন "মায়া"।
(ঘ.) গুরুবাদে গুরুত্ব :-
অন্যান্য ভক্তিবাদী সাধকদের মতো নানকও বিশ্বাস করতেন, একমাত্র প্রকৃত গুরুই পারেন ব্যক্তিকে ঈশ্বর প্রাপ্তির সঠিক পথের সন্ধান দিতে। তাই তিনি তাঁর ধর্মমতে গুরুবাদের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁর মতে, গুরুই শিষ্যকে পথ দেখাবেন।
(ঙ.) সন্ন্যাসের বিরোধিতা :-
নানক নিজে গৃহত্যাগ করে দীর্ঘদিন তীর্থক্ষেত্রে ঘুরে বেরিয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও, ঈশ্বরের সন্ধান পান নি। তিনি তাই তাঁর ধর্মমতে সন্নাসকে নিষিদ্ধ ঘোষনা করেছিলেন। আসলে বাস্তববাদী নানক খুব ভালো করেই জানতেন, সাধারন নারী পুরুষকে একত্রে এই পৃথিবীতে বাস করতে হবে। সৃষ্টি ও জন্মের স্বার্থে সংসারধর্মও পালন করতে হবে। তাদের পেশাগত কাজকর্মও চালিয়ে যেতে হবে। তাই একজন ফকির বা সাধুর সংসার ত্যাগী ধর্মমত কখনই সাধারন মানবগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে পারে না।
গুরু নানকের পুত্র শ্রীচাঁদ যখন সন্ন্যাস গ্রহন করেন, তখন দ্বিতীয় শিখ গুরু অঙ্গদ তাঁর সন্ন্যাসের বিরোধিতা করে ঘোষনা করেন, নানক প্রবর্তিত ধর্মে সন্ন্যাস গ্রহন ও গৃহত্যাগ অনুমোদিত নয়।
(চ.) আধ্যাত্মিক ও জাগতিক জীবনের সমন্বয় :-
গুরু নানক আধ্যাত্মিক ও দৈনন্দিন জীবনের পৃথকীকরনের নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন না। ভারত সহ পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মেই পার্থিব জগতের সঙ্গে অপার্থিব জগতকে ভিন্ন বলে তুলে ধরা হয়। কিন্তু নানক তাঁর ধর্মমতে এই বিভাজন মানেন নি। তাঁর মতে, গৃহীধর্মের সঙ্গে আধ্যাত্মিক সাধনার কোন বিরোধ নেই। তিনি তাই চরম কৃচ্ছসাধন ও চরম ইন্দ্রিয় সুখের মাঝখানের পথ অবলম্বন করার কথা বলেন এবং সৎ গুনের একটি ছোট তালিকাও তিনি তৈরি করে দেন।
এগুলি হলো - বিনয় অভ্যাস করো, অহংকার ত্যাগ করো, মনকে সংযত করো, ঈশ্বরকে স্মরন করো, সৎ হও, সতর্ক হও, পঞ্চ কুপ্রবৃত্তিকে দমন করো, পরিতৃপ্ত থাকো।
(৪.) নানকের ধর্মমত :-
গুরু নানক তাঁর ধর্মমতে এমন কিছু নিয়ম, অনুশাসন ও আদর্শ প্রচার করেন, যেগুলিকে অবলম্বন করে পরবর্তীকালে "শিখ ধর্ম" নামে একটি নতুন ধর্মের জন্ম হয়। নানকের প্রচারিত ধর্মমতকে "গুরুমত" বা "গুর্মত" বলা হয়, যার অর্থ সরাসরি ঈশ্বর নির্দেশিত পথ। কেউবা আবার গুরুমত শব্দটিকে গুরুর নির্দেশাবলি হিসাবেও চিহ্নিত করে থাকেন। এখানে উল্লেখ্য শিখ ধর্মে গুরুকে ঈশ্বরের প্রতিভূ হিসাবেই মনে করা হয়।
(ক.) নানকের ধর্মের মূল কথা ছিলো - "সৎ - শ্রী - আকাল" অর্থাৎ "সত্যস্বরূপ ঈশ্বরের আরাধনা।" ঈশ্বরের আরাধনা করার জন্য নানক বিধিবদ্ধ আচার অনুষ্ঠান ত্যাগ করে কেবলমাত্র ঈশ্বরের ভজনা বা নামকীর্তন করার পরামর্শ দেন।
(খ.) নানক তাঁর প্রচারিত ধর্মমতে তাঁর অনুগামীদের পাঁচটি ব্রত পালন করার নির্দেশ দেন। এগুলি হলো -"নাম" অর্থাৎ ঈশ্বরের ভজনা করা,"সিমরন" অর্থাৎ ঈশ্বরের নামে ধ্যান বা নিমগ্ন থাকা, "আস্নান" অর্থাৎ দৈহিক পবিত্রতা বজায় রাখা, "সেবা" অর্থাৎ নিঃস্বার্থ ও পরোপকারী কাজে নিজেকে উৎসর্গ করা, "দান" অর্থাৎ নিঃস্বার্থ ভাবে নিজের উপার্জনের একটি অংশ দরিদ্রদের সেবায় উৎসর্গ করা। নানক "দশবন্ধ" অর্থাৎ উপার্জনের এক - দশমাংশ দরিদ্রদের দান করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
(গ.) নানক ঈশ্বরের প্রতি সর্বদা তদ্গত থাকার মন্ত্রকে বলেছেন, "সহজ - সমাধ"। তাঁর মতে সহজ বা পরমাত্মার সঙ্গে চূড়ান্ত মিলনের রাজ্যে পৌঁছানোর জন্য কঠিন সাধনা ও শৃঙ্খলার মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। এর বেশ কতকগুলি ধাপ আছে, যাকে নানক বলেছেন খন্ড বা পর্ব। এরকম পাঁচ পর্বের একদম শেষ পর্বে আছে এক চিরন্তন সত্যের জগত। এই পর্বেই আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন ঘটে।
(ঘ.) নানকের মতে, "সবদ" বা ঈশ্বরের নামই হলো এই পৃথিবীর প্রকৃত মহারস বা অমৃত। নানক ঈশ্বর উপলব্ধির জন্য সর্বদা "গুরু" ও "সবদ" - এ নিমজ্জিত থাকাকেই "তারী" বা তপস্যা বলে অভিহিত করেছেন। উল্লেখ্য, নানকের স্তবগান গুলিকে সবদ /শবদ বলা হয়। তাঁর মতে, ঈশ্বরের কৃপা, অনুগ্রহ ও প্রাসাদ লাভ করার জন্য নিজের হৃদয় ও মনকে সর্বদা পরিষ্কার ও শুদ্ধ রাখতে হয়। গুরু নানকের অনুগামীদের গুরুমন্ত্র হলো - "ওয়াহে গুরু" (বিস্ময়কর প্রভু বা ঈশ্বর) ।
(ঙ.) নানক জাতিভেদপ্রথা দূর করার জন্য এবং সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য "সঙ্গৎ" এবং" পঙ্গৎ" বা লঙ্গর নামে দুটি আদর্শের কথা বলেন। সঙ্গত বলতে বোঝায় সমতার আদর্শ ও সম্মিলিত ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পঙ্গৎ বা লঙ্গর হচ্ছে সাধারন রান্নাঘর, যা জাতি, ধর্ম, বর্ন নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত। প্রত্যেক শিখের উপার্জিত আয় ও দৈহিক শ্রম দ্বারাই এই লঙ্গর পরিচালিত হবে। এখানে স্ত্রীলোকেরা রান্না করবে আর পুরুষেরা জোগান দেবে। লঙ্গর ছিলো সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের প্রতীক। নানক করতারপুরে "গুরুদ্বার" এবং "গুরু কা লঙ্গর" (গুরুর রান্নাঘর) নামে একটি লঙ্গরখানা স্থাপন করেন।
(৫.) শিখ ধর্মের উৎপত্তি :-
নানকের শিষ্যদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষেরাই ছিলেন। গুরু নানকের শিষ্যরা "শিখ" নামে পরিচিত হন। শিখ শব্দটি সংস্কৃত শিষ্য কথাটির অপভ্রংশ। শিখ শব্দের অর্থ হলো শিষ্য। নানক নিজে কোন পৃথক ধর্ম প্রতিষ্ঠা না করে গেলেও, তাঁর জীবন দর্শন ও বানীর ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীকালে শিখ ধর্মের উৎপত্তি ঘটে।
১৫৩৯ খ্রিঃ মৃত্যুর আগে নানক তাঁর প্রিয় শিষ্য তথা ভাই লহনকে শিখদের কেন্দ্রীয় সংস্থার দায়িত্ব দেন এবং তাকে "অঙ্গ - ই - খুদ" অর্থাৎ শরীরের একটি অংশ বলে ঘোষনা করেন। তিনি বলেন, মৃত্যুর পর তার আত্মা লহনের দেহে প্রবেশ করবে। লহনই পরবর্তীকালে শিখদের গুরু "অঙ্গদ" নামে পরিচিত হন। এইভাবে গুরু নানক শিখদের মধ্যে যে গুরুবাদের ধারা প্রবর্তন করেন, তাকে দশজন শিখ গুরু ক্রমান্বয়ে এগিয়ে নিয়ে যান। নিজ পুত্রদের দাবি উপেক্ষা করে গুরু নানক গুরু নির্বাচনের যে যোগ্য পন্থার নির্দেশ ও ব্যবস্থা করে যান, তার ফলশ্রুতিতে শিখ নামে একটি নতুন ধর্মের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
নানক প্রবর্তিত শিখ ধর্মের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। যেমন -
- (i.) শিখ ধর্ম ভক্তিবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
- (ii.) এখানে সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীর জীবনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় নি।
- (iii.) শিখ ধর্মে "গুরুবাদ" কে একটি শক্তিশালী আদর্শ রূপে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
- (iv.) শিখ ধর্মাবলম্বীদের জীবন গুরুকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়ে থাকে।
- (v.) ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারনে সমগ্র শিখজাতির জীবনে গুরুর গভীর প্রভাব থাকে।
- (vi.) শিখ ধর্মে জাতিভেদ ও বর্নভেদকে স্বীকার করা হয় না।
- (vii.) নারী - পুরুষের সমানাধিকার ও হিন্দু - মুসলিম সমন্বয়ের আদর্শে এই ধর্ম বিশ্বাসী।
- (viii.) শিখ ধর্মে দান, সেবা, চারিত্রিক শুদ্ধতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
(৬.) নানকের বানীর সংকলিত গ্রন্থ :-
(৭.) ভক্তিবাদী আন্দোলনে নানকের অবদান :-
একঝলকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য :-
- শিখদের প্রথম গুরু ছিলেন - নানক।
- শিখ ধর্মের প্রবর্তক ও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন - গুরু নানক।
- নানক ছিলেন - সিকান্দর লোদীর সমসাময়িক।
- গুরু নানক - আফগানিস্তানে নানক পীর, নেপালে নানক ঋষি, ইরানে বাবা নানক, শ্রীলঙ্কাতে নানকাচার্য, তিব্বতে নানক লামা, সিকিম ও ভুটানে গুরু রিংপোচে, আরবদেশে ভালি হিন্দি নামে পরিচিত ছিলেন।
- নানক ছিলেন - নির্গুন তত্ত্বের একজন প্রচারক।
- যে সমস্ত ভক্তিবাদী সাধকরা ঈশ্বরের নিরাকার রূপে বিশ্বাসী এবং যাবতীয় রক্ষনশীলতা ও জাতিভেদ প্রথার বিরোধী ছিলেন, তাদেরই সাধারনত নির্গুণ তত্ত্বের সাধক বলা হয়।
- জনমসখী গ্রন্থ থেকে - নানকের জীবনী সম্পর্কে জানা যায়।
- নানক জন্মগ্রহন করেন - ১৪৬৯ খ্রিঃ পাঞ্জাবের লাহোর জেলায় রাভি নদীর তীরে তালবন্দী গ্রামে।
- তালবন্দী গ্রামের বর্তমান নাম হলো - নানকানা সাহিব।
- নানকের পিতা - মাতার নাম ছিলো - মেহতা কালু চাঁদ ও তৃপ্তা দেবী।
- নানক হিন্দি ভাষা শেখেন - গোপাল পান্থারের কাছে।
- নানক সংস্কৃত ভাষা শেখেন - বৈদনাথ পন্ডিত/বৃজনাথ পন্ডিতের কাছে।
- নানক ফারসি ভাষা শেখেন - মোল্লা কুতুবউদ্দিনের কাছে।
- নানক চাকুরি করতেন - সুলতানপুরে নবাব দৌলত খান লোদীর অধীনে।
- নানকের স্ত্রীর নাম ছিলো - সুলখনা চৌনী।
- নানকের দুই পুত্রের নাম ছিলো - শ্রীচাঁদ ও লক্ষীচাঁদ ।
- আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য নানকের সুদীর্ঘ সন্ন্যাসযাত্রা - উদাসী যাত্রা নামে পরিচিত।
- নানকের মৃত্যু হয় - ১৫৩৯ খ্রিঃ করতারপুরে।
- নানকের ধর্মের মূল কথা ছিলো - "সৎ - শ্রী - আকাল" অর্থাৎ সত্যস্বরূপ ঈশ্বরের আরাধনা।
- নানক "অঙ্গ - ই - খুদ" বা শরীরের একটি অংশ বলে অভিহিত করেন - তাঁর ভাই লহনকে।
- শিখদের দ্বিতীয় গুরু ছিলেন - অঙ্গদ।
- শিখদের ধর্মগ্রন্থের নাম হলো - গ্রন্থ সাহেব।
- গ্রন্থ সাহেব সংকলন করেন - পঞ্চম শিখগুরু অর্জুন।
- গ্রন্থসাহেব রচিত হয় - গুরুমুখী ভাষায়।
- নানকের প্রচারিত ধর্মমতকে বলা হয় - গুরুমত বা গুর্মত।
- গ্রন্থসাহেবে সংকলিত হয় গুরু নানকের - ৯৭৪ টি বানী।
কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ শব্দের অর্থ :-
- শিখ - শিষ্য।
- গুরুমত - নানকের প্রচারিত ধর্মমতকে গুরুমত বলা হয়।
- সৎ - শ্রী - আকাল - সত্যস্বরূপ ঈশ্বরের আরাধানা।
- সিমরন - ঈশ্বরের নামে ধ্যান বা নিমগ্ন থাকা।
- আস্নান - দৈহিক পবিত্রতা বজায় রাখা।
- দশবন্ধ - উপার্জনের এক দশমাংশ, যা নানক দরিদ্রদের সেবায় দান করার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
- শবদ/সবদ - নানকের প্রচারিত স্তবগান।
- ওয়াহে গুরু /বাহে গুরু - বিস্ময়কর প্রভু, এটি নানকের অনুগামীদের গুরুমন্ত্র ছিলো।
- সঙ্গত - সমতার আদর্শ ও সম্মিলিত ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ
- পঙ্গৎ বা লঙ্গর - সাধারন রান্নাঘর, যা জাতি, ধর্ম, বর্ন সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিলো।
- গুরু কা লঙ্গর - গুরুর রান্নাঘর।
- অঙ্গ - ই - খুদ - শরীরের একটি অংশ বা ভাগ।
- আদি গ্রন্থ - গুরু গ্রন্থ সাহিবকে আদি গ্রন্থ বলা হয়।
- জপজী - গ্রন্থসাহিবের প্রথম অধ্যায়ের নাম।
- গুরুমুখী ভাষা - গুরুর মুখ নিসৃত ভাষা/পাঞ্জাবি ভাষা।
