"ভক্তিবাদী আন্দোলন" ছিলো মধ্যযুগের ভারতবর্ষের একটি উদারনৈতিক ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলন। ভারতবর্ষে (১.) আদি মধ্য যুগের সূচনায় খ্রিঃ সপ্তম শতাব্দী থেকে শুরু করে দ্বাদশ শতকের মধ্যে দ্রাবিড়ভূমে অর্থাৎ দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু, কেরালা ও কর্নাটক অঞ্চলে সর্বপ্রথম এই আন্দোলনের উদ্ভব ঘটেছিলো। (২.) ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে এই ধর্মীয় ভক্তিবাদী আন্দোলনের ধারা দক্ষিণ ভারত থেকে ক্রমে উত্তর ভারতে সম্প্রসারিত হয়। (৩.) এরপর চতুর্দশ শতাব্দী থেকে শুরু করে পঞ্চদশ বা ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কালে বিভিন্ন সাধকদের হাত ধরে সমগ্র উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম ভারতে "ভক্তিবাদ" আন্দোলনের আকারে ছড়িয়ে পড়ে ও ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
 |
| ভক্তিবাদী আন্দোলন |
ভক্তিবাদী আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত পরিচয় :-
(ক.) ভক্তিবাদের অর্থ ও ধারনা :-
ভক্তিবাদী আন্দোলনের সঙ্গে তিনটি শব্দ খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে যুক্ত - "ভক্তি", "ভক্ত" এবং "ভক্তিবাদ"।
বুৎপত্তিগত অর্থে সংস্কৃত "ভক্তি" শব্দটির অর্থ হলো - ভাগ করা। যেমন গুপ্তযুগে প্রদেশ গুলিকে বলা হতো "ভুক্তি"। আবার রামশরন শর্মা দেখিয়েছেন, প্রাচীন ভারতে ভাত বা অন্নকেও ভক্তি অর্থে ব্যবহার করা হতো। সংস্কৃত "ভক্তি" শব্দটির উৎপত্তি হয়েছিলো "ভক্ত" শব্দটি থেকে। "ভক্ত" শব্দের মানে হলো দাস, যে তার প্রভুর সম্পদের কিছু অংশ ভোগের অধিকারী। সেবার মনোভাব এবং সেবকের দশাভাব থেকেই "ভক্তি" কথাটির উৎপত্তি ঘটেছিলো। সমাজে রাজা ও তাঁর অধীন কর্মচারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম ভক্তিবাদী ধারনার প্রতিফলন দেখা যায়। মধ্যযুগে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজা ও ভূস্বামী এবং ভূস্বামীদের ওপর প্রজা বা আধা ভূমিদাসদের সম্পূর্ন নির্ভরশীলতার সম্পর্ক ভক্তিবাদ দ্বারাই প্রভাবিত হয়েছিলো। "ভক্তি" বা "ভক্তের" উৎপত্তিগত ধারনার সঙ্গে ভক্তিবাদী আন্দোলনের "ভক্তি" বা "ভক্ত" ধারনাটির অর্থ খুব বেশি যে আলাদা ছিলো এমন নয়।
ধর্মীয় ক্ষেত্রে "ভক্তি" বলতে বোঝায় ঈশ্বরের প্রতি অনুরাগ বা শ্রদ্ধা এবং ঈশ্বরের কাছে নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করে তাঁর ভজনা বা আরাধনা করা। যিনি ভক্তিভরে একনিষ্ঠ ভাবে ঈশ্বরের ভজনা বা আরাধানা করেন তিনিই "ভক্ত"। আর "ভক্তিবাদ" হলো এমন এক ধর্মীয় দর্শন, যা ব্যক্তিকে এক নির্দিষ্ট পথে ঐশ্বরিক ভাবনায় অনুরঞ্জিত করে। "ভাগবতগীতাই" হলো ভারতের প্রথম ধর্মগ্রন্থ যেখানে "ভক্তি" শব্দটিকে সর্বপ্রথম ধর্মীয় পথ অর্থে তুলে ধরা হয়।
(খ.) ভক্তিবাদী আন্দোলনের মূল বৈশিষ্ট্য :-
সপ্তম থেকে ষোড়শ শতাব্দীতে ভারতে যে ভক্তিবাদী আন্দোলন চলেছিলো, তার মধ্যে বেশ কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। এগুলি হলো -
- (১.) ঈশ্বর ভক্তিতে গুরুত্ব :- ভক্তিবাদী আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিলো ঈশ্বরের প্রতি প্রেম ও ভক্তি। ভক্তিবাদী সাধকরা ভক্তি ও প্রেমের মাধ্যমে ঈশ্বরের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের কথা বলেছিলেন।
- (২.) ভক্ত ও ভগবানের সম্পর্ক স্থাপন :- ভক্তিবাদী প্রচারকরা ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তাঁরা প্রচার করেন, ভগবানকে ডাকার জন্য অথবা তার সহিত সম্পর্ক স্থাপনের জন্য তৃতীয় কোন ব্যক্তি বা পুরোহিতের কোন প্রয়োজন নেই।
- (৩.) স্থানীয় ভাষায় গুরুত্ব আরোপ :- ভক্তিবাদী প্রচারকরা বলেন ভববানকে ডাকতে হবে অন্তরের ভক্তি ও আকুতি দিয়ে। ভগবান তাঁর ভক্তের হৃদয়ের ভাষা বোঝেন। তাই ভগবানকে আরাধনা করার জন্য কোন বিশেষ ভাষার (সংস্কৃত) প্রয়োজন নেই। ভক্তিবাদী সাধকরা যে যার আঞ্চলিক ভাষাতেই ভক্তিবাদ প্রচার করেন।
- (৪.) সামাজিক বিভেদের প্রতিবাদ :- সকল ভক্তিবাদী সন্তই প্রচার করেন মানুষ ঈশ্বরের সৃষ্টি। তাই ঈশ্বরের সমিপে সকলেই সমান। ভক্তিবাদী প্রচারকরা তাই সবরকমের সামাজিক বৈষম্য ও জাতপাতের বিরোধিতা করেন।
- (৫.) ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের বিরোধিতা :- ভক্তিবাদীরা ঈশ্বর আরাধনার জন্য সবরকম বাহ্যিক আচার অনুষ্ঠানেরও বিরোধিতা করেন। তারা বলেন, শুদ্ধ ভক্তি ও নামগানের মধ্য দিয়েই ঈশ্বরকে লাভ করা সম্ভব।
- (৬.) পরিভ্রমনের মাধ্যমে ভক্তিবাদ প্রচার :- ভক্তিবাদী সাধকদের প্রায় সকলেই পায়ে হেঁটে তাদের নিজ নিজ অঞ্চলে ভক্তিবাদের প্রচার ও প্রসার করেন। তাদের অনেকে প্রবচন, ভজন, কীর্তন ও গ্রন্থরচনার মধ্য দিয়ে ভক্তিবাদ প্রচার করেন।
- (৭.) আঞ্চলিক ধারা ও ঐতিহ্য :- ভক্তিবাদী আন্দোলনের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দিক ছিলো এর স্থানীয় বা আঞ্চলিক ঐতিহ্য। ভক্তিবাদী পর্বে বিভিন্ন ভক্তিবাদী সাধকরা তাদের নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের ভিতরেই ভক্তিবাদকে প্রচার করেন। যেমন আলওয়ার ও নায়নার সম্প্রদায়রা দক্ষিন ভারতে, শ্রীচৈতন্যদেব বাংলায় এবং গুরুনানক পাঞ্জাবে, জ্ঞানদেব, নামদেব, রামদাস মহারাষ্ট্রে, শঙ্করদেব আসামে ভক্তিবাদ প্রচার করেন।
- (৮.) শৈব ও বৈষ্ণববাদের প্রাধান্য :- আদিমধ্য যুগ এবং পূর্নমধ্যমুগের ভিতরে চলা দুটি পর্বের ভক্তিবাদী আন্দোলনের মধ্যেই শৈব ও বৈষ্ণববাদের ধারা লক্ষ্য করা যায়। এই সময়ের ভক্তিবাদী সাধকরা ভগবান শিব এবং রাম ও কৃষ্ণের ভক্তিবাদী উপাসনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
(গ.) ভক্তিবাদী আন্দোলনের মূল নীতি ও আদর্শ :-
ভক্তিবাদী সাধকেরা কতকগুলি বক্তব্য প্রচার করেন। সেগুলিকে ভক্তিবাদী আন্দোলনের মূল নীতি ও আদর্শ বলা যেতে পারে। এগুলি হলো -
- (১.) একেশ্বরবাদে বিশ্বাস,
- (২.) ব্রাহ্মন্যবাদী আচার অনুষ্ঠান, যাগযজ্ঞ ও পুজাপদ্ধতির বিরোধিতা করা,
- (৩.) মূর্তিপুজা, পুরোহিত প্রাধান্য ও জাতপাতের বিরোধিতা করা,
- (৪.) গুরুবাদে গুরুত্ব আরোপ,
- (৫.) নানা অন্ধবিশ্বাস, অর্থহীন উপাচার ও ধর্মীয় রীতিনীতির বদলে যুক্তিসঙ্গত আচার আচরনের ওপর গুরুত্ব আরোপ,
- (৬.) পারস্পরিক ঘৃনা, বিদ্বেষ দূর করে সামাজিক সাম্য ও সৌভ্রাতৃত্বের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা।
(ঘ.) ভক্তিবাদী আন্দোলনের ধারা ও পর্যায় : আদিমধ্যযুগ বনাম মধ্যযুগ
আমরা আলোচনার একেবারে গোড়াতেই বলেছি, মধ্যযুগে যে ভক্তিবাদী আন্দোলনের উদ্ভব ঘটেছিলো তাতে দুটি পৃথক ধারা বা পর্যায় ছিলো।
(১.) খ্রিঃ সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকে অর্থাৎ আদিমধ্য যুগে সর্বপ্রথম ভক্তিবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিলো দক্ষিণ ভারতে। অন্যদিকে (২.) চতুর্দশ শতাব্দী থেকে পঞ্চদশ বা ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত উত্তর ভারত ও পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভক্তিবাদী আন্দোলন চলেছিলো। দক্ষিণ ও উত্তর - পূর্ব ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলনের মাঝে সময়ের একটি বড়ো ব্যবধান থাকলেও, এই দুটি কখনই পৃথক কোন আন্দোলন ছিলো না। দক্ষিন ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলনের ধারাই নানা ভক্তিবাদী সন্ত ও সাধকদের মধ্য দিয়ে শেষপর্যন্ত উত্তর ভারতে পৌঁছেছিলো এবং মধ্যযুগে ভক্তিবাদের প্লাবন বয়ে এনেছিলো। যদিও দক্ষিন ও উত্তর ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলনের ধরন, চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে নানা পার্থক্য ছিলো। ভারতের দুই প্রান্তে দুই ভিন্ন সময়কালে সংগঠিত ভক্তিবাদী আন্দোলনের প্রকৃতিও এক ছিলো না।
(এক.) দক্ষিণ ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলন (সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতক) :-
দক্ষিণ ভারতে ভক্তিবাদী আন্দোলন হয়েছিলো মূলত জৈন ও বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে। তৎকালীন দক্ষিন ভারতে সমাজ, রাজনীতি ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে বৌদ্ধ ও জৈনদের প্রভাব ছিলো খুবই ব্যাপক। মনে রাখতে হবে, দক্ষিণ ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলনের ওপর ইসলামের তেমন প্রভাব ছিলো না। অন্যদিকে ব্রাহ্মন্যতন্ত্রের বিরুদ্ধেও কোন ক্ষোভ ছিলো না।
দক্ষিণ ভারতে আর্য সংস্কৃতির প্রভাব অনেক দেরিতে পড়েছিলো। ফলে ব্রাহ্মন্যবাদের প্রভাব উত্তর ভারতের মতো দক্ষিণ ভারতে প্রকট ছিলো না। সেখানে ক্ষত্রিয় নামক বর্নের অস্তিত্ব ছিলো না। ব্রাহ্মনদের সংখ্যাও ছিলো তুলনামূলকভাবে অনেক কম। বর্নাশ্রম প্রথা না থাকায় দক্ষিণ ভারতে সামাজিক ভেদাভেদের তীব্রতা ছিলো খুবই কম। সেখানকার সমাজকাঠামো ছিলো উপজাতীয় ঢঙের। খুব স্বাভাবিক ভাবে দক্ষিণ ভারতের সমাজে ব্রাহ্মন্যবাদীতার নাগপাশের কঠোরতাও কম ছিলো। উত্তর ভারতের মতো ব্রাহ্মন্যতন্ত্র কখনই দক্ষিণ ভারতে অত্যাচারের পর্যায়ে নেমে আসে নি। এই কারনে দক্ষিণ ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলনের ভিতর কোন ব্রাহ্মন্যবাদ বিরোধী চরিত্র লক্ষ্য করা যায় না।
খ্রিষ্ট পূর্ব ষষ্ঠ শতকে ব্রাহ্মন্যবাদী ধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ স্বরূপ ৬৩ টি প্রতিবাদী ধর্মের উদ্ভব ঘটেছিলো। এর মধ্যে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম ভারতের ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের চাপে ব্রাহ্মন্যবাদী হিন্দু ধর্ম প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পড়ে।
(১.) এমতাবস্থায় জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের নাগপাশ থেকে দক্ষিণ ভারতের মানুষকে মুক্ত করার জন্য শৈব নায়নার এবং বৈষ্ণব আলওয়ার সম্প্রদায় খ্রিঃ সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে ভক্তিবাদী আন্দোলনের সূচনা করে। সেখানে জৈন ও বৌদ্ধদের কঠোর সংযমী জীবন - যাপনের বিরুদ্ধে অনন্ত শান্তি লাভের জন্য ভাগবৎ প্রেমের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। শৈব নায়নার ও বৈষ্ণব আলওয়ার সম্প্রদায়ের স্তবগানের মধ্য দিয়ে দক্ষিণে ভক্তিবাদ বিকশিত হয়। নয়নার ও আলওয়ার সম্প্রদায় স্থানীয় ভাষা তামিল বা কানাড়ীতে হিন্দুদের জাতিভেদ ও অন্যান্য সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ঈশ্বরের ভক্তি ও প্রেমের আদর্শ তুলে ধরে জৈন বা বৌদ্ধ ধর্মের সাম্যবাদকে ভোঁতা করে দেন। ক্রমে তামিল সাধকদের ভক্তিবাদের কাছে জৈন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্ম নিস্প্রভ হয়ে পড়ে।
(২.) আলওয়ার ও নায়নারদের আন্দোলন চলাকালীন সময়েই দক্ষিন ভারতের শৈব ও বৈষ্ণব ভক্তিবাদকে এগিয়ে নিয়ে যান আরও বেশ কিছু সাধক। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শঙ্করাচার্য, রামানুজ, নিম্বার্ক ও মাধবাচার্য।
- শঙ্করাচার্য নবম শতকের গোড়ায় কেরালায় জন্মগ্রহন করেন। তিনি দক্ষিণ ভারতে হিন্দু ধর্মকে জনপ্রিয় করে তোলেন এবং আধুনিক হিন্দু ধর্মের কাঠামো নির্মান করেন। শঙ্করাচার্য হিন্দুধর্ম পুনঃস্থাপনের জন্য অদ্বৈতবাদ প্রচার করেন এবং ভারতের চার প্রান্তে চারটি মঠ স্থাপন করেন (যোশী মঠ, গোবর্ধন মঠ, শৃঙ্গেরী মঠ, সারদা মঠ) ।
- শঙ্করাচার্যের পর একাদশ থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে রামানুজ, নিম্বার্ক এবং মাধবাচার্য দক্ষিণ ভারতে ভক্তিবাদী বৈষ্ণব আন্দোলনকে বহুদূর প্রসারিত করেন।
- ক্রমে তামিল, কর্নাটক ও কেরালা রাজ্য অতিক্রম করে বৈষ্ণববাদী ভক্তি আন্দোলন দক্ষিণের মহারাষ্ট্র ও ঊড়িষ্যাকেও প্রভাবিত করে। দ্বাদশ শতকের শেষদিকে মহারাষ্ট্রে ভক্তিবাদী সাধক জ্ঞানদেবের নেতৃত্বে পান্ধারপুরের বিঠোভা (বিষ্ণু) মন্দিরকে কেন্দ্র করে বারকরী বৈষ্ণব আন্দোলন সংগঠিত হয়। জ্ঞানদেবের পর মহারাষ্ট্রে এই বৈষ্ণব আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যান নামদেব,তুকারাম, একনাথ, রামদাস প্রমুখ সাধকেরা।
দক্ষিন ভারতে জৈন ও বৌদ্ধ বিরোধী ভক্তিবাদী আন্দোলন দক্ষিণ ভারতে শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটায় নি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন ঘটায়। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকে দক্ষিনী ভক্তিবাদের ফলে দক্ষিন ভারতের সমাজ থেকে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রভাব দূর হয়।
পান্ড্য, চোল, কলচুরি প্রভৃতি দক্ষিনী রাজতন্ত্রগুলি বৌদ্ধ ও জৈনদের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়। ভক্তিবাদী হিন্দুধর্ম রাজানুগ্রহ লাভ করে। দক্ষিনের পল্লব রাজারা ভক্তি আন্দোলনকে সমর্থন করে এগিয়ে নিয়ে যেতে অনেকখানি সাহায্য করেন। পল্লবরাজ মহেন্দ্রবর্মন ভক্তিবাদে প্রভাবিত হয়ে তাঁর রাজ্যের জৈন মঠগুলি ধ্বংস করেন এবং জৈন সন্ন্যাসীদের বিতাড়িত করেন। নবম থেকে ত্রয়োদশ শতকের শক্তিশালী চোল রাজারাও ভক্তিবাদী ঐতিহ্যের ধারাকে সমর্থন করেছিলেন। এর জন্য তারা অনেক শিব ও বিষ্ণুর মন্দির নির্মান করান এবং ভূমিদান করেন। এইসময়ে চোলদের তৈরি বিখ্যাত শিবের মন্দির গুলির মধ্যে অন্যতম ছিলো - "চিদাম্বরাম মন্দির" "তাজ্ঞাভুর মন্দির" ও "গঙ্গোইকোন্ডচোলপুরমের মন্দির।
দক্ষিনী ভক্তিবাদের ফলে ভারতে মন্দির নির্মানে প্লাবন আসে। ভক্তিবাদের প্রসারে একদিকে মন্দির নির্মান যেমন রাজানুকুল্য পায়, তেমনি বহু জৈন ও বৌদ্ধ মঠ মন্দিরে শৈব ও বৈষ্ণব ভক্তিবাদ এবং দেবতাকে প্রতিষ্ঠিত করে বৌদ্ধ ও জৈনদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গুলিকে দখল করে নেওয়া হয়। ভগবান বুদ্ধকে বিষ্ণুর অবতার বলে প্রচার করা হয়। ঊড়িষ্যায় বৌদ্ধ জগন্নাথ মঠকে কেন্দ্র করে জগন্নাথ মতবাদ গড়ে ওঠে। দ্বাদশ শতকে রামানুজের প্রচেষ্টায় জগন্নাথদেব বিষ্ণুরূপে পূজিত হতে শুরু করেন।
এইভাবে দেখা যায় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকে শৈব ও বৈষ্ণব ভক্তিবাদের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ ভারতে ভক্তিবাদী আন্দোলন চলেছিলো। এই আন্দোলন দক্ষিণ ভারতকে জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের কবল থেকে মুক্ত করে সনাতন হিন্দুধর্মকে নতুন রূপ বা ফর্মে পুনঃস্থাপন করে। এইকারনে দক্ষিন ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলনকে অনেক গবেষক "হিন্দুত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন" বলেও অভিহিত করেন।
দক্ষিন ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলনের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিলো যেমন -
- এই আন্দোলন কখনো সচেতনভাবে ব্রাহ্মনবাদকে আক্রমন করেনি।
- ব্রাহ্মন্যবাদের বিভিন্ন রীতি নীতি যেমন মন্দিরের গুরুত্ব, পুজার রীতিনীতি, বৈদিক মন্ত্র উচ্চারন, তীর্থযাত্রা ইত্যাদি বিষয় গুলিকে মেনে নিয়েছিলো।
- জাতপাত ও সামাজিক বৈষম্যের বিরোধিতা করেও এই আন্দোলন কিছুটা হলেও, বর্নভেদ ব্যবস্থার সঙ্গে আপোস করে নিয়েছিলো।
(দুই.) উত্তর ভারতে ভক্তিবাদী আন্দোলন (চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দী) :-
উত্তর ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলন শুরু হয়েছিলো কিছুটা দেরিতে। আনুমানিক চতুর্দশ শতাব্দীর শেষ বা পঞ্চদশ শতাব্দী থেকেই উত্তর ভারতে ভক্তিবাদী আন্দোলন শুরু হয়। সুলতানি আমলে যে ভক্তিবাদী আন্দোলন উত্তর পূর্ব ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিলো, তার সঙ্গে দক্ষিণ ভারতের ভক্তি আন্দোলনের যোগসূত্রের কথা অনেক ঐতিহাসিকই বলে থাকেন। সুলতানি যুগে উত্তর - পূর্ব ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলনকে তারা দক্ষিণ ভারতের ভক্তি আন্দোলনের একটি সম্প্রসারিত রূপ বা পুনঃজাগরন হিসাবে অভিহিত করে থাকেন।
(অ.) আদিমধ্য যুগের - দক্ষিণ ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলন এবং (আ.) মধ্যযুগের - (সুলতানি আমলে) উত্তর পূর্ব ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলনের মধ্যে অনেক দার্শনিক ও মতাদর্শগত মিল ছিলো।
(১.) দুটি আন্দোলনই একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিলো। (২.) ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও আচারবাদকে উপেক্ষা করে ভক্তিবাদের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলো। (৩.) স্থানীয় ভাষায় ধর্মপ্রচার করেছিলো। (৪.) মানুষের সঙ্গে মানুষের, আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের কথা বলেছিলো। (৫.) সামাজিক বৈষম্য ও জাতপাতের বিরোধিতা করেছিলো। (৬.) নানা অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিরোধিতা করেছিলো।(৭.) গুরুবাদের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলো।(৮.) জাত - ধর্ম - বর্ন নির্বিশেষে সমন্বয়ের কথা, প্রেমের কথা, ভালোবাসার কথা বলেছিলো। এই উদারনৈতিক ভাবধারার ফলে বহু মুসলিম, অস্পৃশ্য ও নিন্মবর্গের মানুষ দুই ভক্তিবাদী আন্দোলনেই আকৃষ্ট ও শিষ্যত্ব গ্রহন করেছিলো।
উত্তর ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলনের সূত্রধর ছিলো দক্ষিনের ভক্তিবাদী আন্দোলন। ত্রয়োদশ শতাব্দীর ভিতর দক্ষিন ভারত থেকে ভক্তিবাদের ধারা ধীরে ধীরে উত্তরে প্রবেশ করতে শুরু করেছিলো। এইসময় দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন সাধক ও তাদের শিষ্যরা পরিভ্রমনের মাধ্যমে ভক্তিবাদী দর্শনের ভাবধারা উত্তর - পূর্ব ভারতে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
(১.) দ্বাদশ শতকে উত্তর ভারতে ভক্তিবাদী আন্দোলনের প্রসারে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন রামানুজ ও তাঁর শিষ্য রামানন্দ। রামানুজ তাঁর বিশিষ্টদ্বৈতবাদ এবং বৈষ্ণব ধর্মের প্রচারে দক্ষিন ভারতের নানা অঞ্চলে পরিভ্রমন করেন। তিনি ঊড়িষ্যার জগন্নাথদেবকে বিষ্ণু রূপে অভিহিত করেন। দ্বাদশ শতকের পর ঊড়িষ্যার জগন্নাথ আন্দোলন এবং মহারাষ্ট্রের বৈষ্ণব বারকরী আন্দোলন ভক্তি আন্দোলনের উত্তরমুখী যাত্রাকে বিশেষভাবে ত্বরান্বিত করে।
(২.) তবে রামানুজের শিষ্য রামানন্দের হাত ধরেই দক্ষিন ভারত থেকে ভক্তিবাদ উত্তর ভারতে আসে এবং তা জলোচ্ছ্বাসে পরিনত হয়। রামানন্দের কাছ থেকেই ভক্তিবাদী আন্দোলনের দুটি প্রধান ধারা কবীর এবং তুলসীদাসের মাধ্যমে উত্তর ভারতে প্রসারিত হয়। বলা বাহুল্য, ভক্ত কবির এবং তুলসিদাস দুজনেই রামানন্দের শিষ্য ছিলেন। উত্তর ভারতের অপর একজন ভক্তিবাদী সাধক দাদু দয়ালও ছিলেন রামানন্দ গোষ্ঠীরই শিষ্য।
(৩.) দক্ষিনী বৈষ্ণব সাধকেরা দ্বাদশ শতাব্দীর শেষদিক থেকে উত্তর ভারতে তাদের ভক্তিবাদী দর্শনের প্রচার করেছিলেন। সর্ব্বাচার্য ত্রয়োদশ শতকে কেরল থেকে উত্তর ভারতে তাঁর দ্বৈতবাদের সমর্থনে প্রচারের উদ্দেশ্যে আসেন। নিম্বার্ক খুব সম্ভবত বারোশো শতকের শেষ বা ত্রয়োদশ শতকে তাঁর দ্বৈতাদ্বৈতবাদ এবং বল্লভাচার্য চতুর্দশ শতকে শুদ্ধাদ্বৈতবাদ প্রচারে উত্তর ভারতে আসেন। এইসমস্ত সাধকদের মধ্য দিয়েই দ্বাদশ শতাব্দীর শেষ বা ত্রয়োদশ শতাব্দী জুড়ে ভক্তিবাদ খুব ধীর গতিতে উত্তর ভারতে তাঁর প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেছিলো।
(৪.) দক্ষিন ভারতের একজন প্রখ্যাত ভক্তিবাদী বৈষ্ণবাচার্য ছিলেন মাধবাচার্য। অনেক ঐতিহাসিকই পূর্ব ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ ভক্তিবাদী সাধক শ্রীচৈতন্যদেবকে মাধবাচার্য গোষ্ঠীর একজন প্রচারক হিসাবে ব্যাখ্যা করেন। আবার কৃষ্ণ ভক্তির গুরুত্বের কারনে অনেকে তাঁকে নিম্বার্কের সঙ্গেও সম্পর্কযুক্ত করে থাকেন। অন্যদিকে দক্ষিন ভারতের বৈষ্ণব সাধক বল্লভাচার্যের শিষ্য ছিলেন উত্তর ভারতের ভক্তিবাদী প্রচারক সুরদাস।
এইভাবে দেখা যায়, দক্ষিন ও উত্তর ভারতের ভক্তি আন্দোলন দুটি পৃথক সময়ে সংগঠিত হলেও, দুটি আন্দোলনের ভিতরেই এক গভীর সংযোগ ছিলো। অনেকেই এক্ষেত্রে প্রশ্ন তোলেন, দক্ষিণ ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলন যদি উত্তর পূর্ব ভারতে এসে থাকে তাহলে দুই মেরুর আন্দোলনের মধ্যে সময়ের এই বিরাট ব্যবধান কেন ছিলো? এর উত্তরে বলা যায়, দুটি কারনে উত্তর ভারতে ভক্তিবাদী আন্দোলন শুরু হতে দেরি হয়।
প্রথমত, ভাষার প্রতিবন্ধকতার কারনে দক্ষিণ ভারতের ভক্তিবাদ উত্তর ভারতে প্রবেশ করতে একটু দেরি হয়েছিলো। তৎকালীন সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার মতো উন্নত ছিলো না। সেই সময়ের ভক্তিবাদী প্রচারকরা পায়ে হেঁটেই ভক্তিবাদ প্রচার করেন।
দ্বিতীয়ত, উত্তর - পূর্ব ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন ভক্তিবাদ প্রচারের অনুকূল ছিলো না। তখন উত্তর ভারতে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নানা অস্থিরতা ও পালাবদল চলছিলো। ত্রয়োদশ শতকের প্রথম তিন দশকের মধ্যে উত্তর ভারতে তুর্কি শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেও, উত্তর ভারতকে ভক্তি আন্দোলন প্রত্যক্ষ করার জন্য প্রায় পনেরো শতক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। মধ্যবর্তী এই সময়কালটিতে চলেছিলো নানা যুদ্ধবিগ্রহ ও হিংসা, রক্তপাত, বলপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তকরন, মন্দির ধ্বংস, লুঠপাট, মোঙ্গল আক্রমন ইত্যাদি সব ঘটনা। রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে তখন উত্তর ভারতে ছিলো নানা অস্থিরতা ও উত্তেজনা।
পনেরো শতকের মধ্যে ভারতীয় সমাজে ইসলামের উগ্রতা ও হিন্দু - মুসলিম সংঘাতের তীব্রতা অনেকটাই স্তিমিত হয়ে আসে। ধীরে ধীরে সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক গুলিতে হিন্দু - মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সদ্ভাব ও সমন্বয় দেখা যায়। এই উদারনৈতিক প্রেক্ষাপটেই উত্তর - পূর্ব ভারতে ভক্তিবাদী আন্দোলনের উদ্ভব ঘটে। এইসময় উত্তর পূর্ব ভারতে একের পর এক ভক্তিবাদী সাধকের আবির্ভাব ঘটে।
এইসব ভক্তিবাদী সাধকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন - রামানন্দ, কবীর ও তুলসিদাস, সুরদাস, বল্লভাচার্য, দাদু দয়াল, মীরাবাঈ, গুরু নানক, শ্রীচৈতন্যদেব, শ্রীমন্ত শঙ্করদেব প্রমুখ।
দক্ষিণ ভারতের ভক্তিবাদের সলতেতে উত্তর ভারতের ভক্তিবাদের প্রদীপ প্রজ্বলিত হলেও, বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতির দিক থেকে উত্তরের আন্দোলন দক্ষিণের আন্দোলন থেকে অনেকটাই আলাদা ছিলো। (অ.) দক্ষিণ ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলন যেমন অনেকাংশে মন্দিরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছিলো। উত্তর ভারতের ক্ষেত্রে তা হয় নি। (আ.) উত্তর ভারতে ব্রাহ্মন্যবাদের প্রকট ও দাপট ছিলো খুব বেশি। এখানকার নিন্মবর্গের মানুষ ব্রাহ্মন্যবাদের অত্যাচারে জর্জরিত ছিলো। উত্তর ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রায় সব ধর্মপ্রচারকই ব্রাহ্মন্যবাদের বিরোধিতা করে সামাজিক ও ধর্মীয় সাম্যের কথা প্রচার করেন। তাদের কেউ কেউ ধর্মপালনের ক্ষেত্র তীর্থযাত্রা বা মন্দিরের অপরিহার্যতাকেও অস্বীকার করেন। এমনকি পৌত্তলিকতা বা মূর্তিপূজারও তারা বিরোধিতা করেন।
আসলে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের ভক্তিবাদী আন্দোলনের তাগিদ এবং প্রয়োজন ছিলো ভিন্ন ভিন্ন। দক্ষিণ ভারতের ভক্তিবাদী প্রচারকরা জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের কবল থেকে দক্ষিণ ভারতকে মুক্ত করে হিন্দু ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে উত্তর ভারতের ভক্তিবাদী প্রচারকদের তাগিদ ছিলো ইসলামের আগ্রাসন থেকে হিন্দু ধর্মকে রক্ষা করা। ইসলামের ভাবাবেগের সঙ্গে সাজুর্য্য রেখে তারা তাই নবরূপে হিন্দুধর্মের সংস্কার করেন। তারা ব্রাহ্মন্যবাদ, মন্দির, পুজাপদ্ধতি, মন্ত্রোচ্চারন ইত্যাদিকে বাদ রেখেই ইসলামের একেশ্বরবাদের ভক্তিমূলক ভাবনায় হিন্দুধর্মের সংস্কার করেন। তাদের সেই প্রচেষ্টা বহুগুনে সফলও হয়। এরই পরিনামে মধ্যযুগে লক্ষ লক্ষ হিন্দুর ধর্মান্তকরন আটকে যায়। এতদিন ধরে হিন্দুসমাজে ব্রাহ্মন্যবাদী সমাজব্যবস্থার অত্যাচারে দলে দলে ইসলামে ধর্মান্তরিত হচ্ছিলেন, তারা ইসলামের শত অত্যাচার সত্ত্বেও হিন্দু ধর্মেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এখানেই ভক্তিবাদী আন্দোলনের সবথেকে বড়ো সাফল্য ছিলো।
(তিন.) দুই আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা ও পরিনতি :-
সবশেষে বলা যায়, আদিমধ্যযুগে সংগঠিত দক্ষিণ ভারতের ভক্তি আন্দোলন এবং মধ্যযুগে সুলতানি আমল এবং মুঘল যুগে উত্তর ভারত ও পূর্ব ভারতে সংগঠিত ভক্তি আন্দোলনের মধ্যে বেশ কিছু সীমাবদ্ধতাও ছিলো। দুটি আন্দোলনই ধর্মীয় ও সামাজিক সাম্যের কথা বলেছিলো। জাতপাতের বিরোধিতার কথা বলেছিলো। কিন্ত কখনই বর্নবৈষম্যবাদের সম্পূর্ন উচ্ছেদের কথা বলে নি অথবা ধর্মীয় গ্রন্থ গুলির ওপর ব্রাহ্মনদের একচেটিয়া প্রাধান্য ও তাদের সুযোগ সুবিধার বিরোধিতা করে নি। দক্ষিণ ভারতের ভক্তি আন্দোলনের মতো উত্তর - পূর্ব ভারতেও বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলন অনেক ক্ষেত্রেই শেষ পর্যন্ত ব্রাহ্মন্য ধর্মের সঙ্গেই মিলে যায়।