ভক্তিবাদী আন্দোলনের উৎস ও উদ্ভবের কারন

মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ঐতিহাসিক ঘটনা ছিলো ভক্তিবাদী আন্দোলনের উদ্ভব। ভক্তিবাদী আন্দোলন একদিকে মধ্যযুগের হিন্দু - মুসলিম বৈরিতাকে দূর করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি স্থাপনে যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলো, তেমনই মধ্যযুগে মুসলিম আক্রমনে জর্জরিত হিন্দু ধর্মকে নবরূপে পুনঃস্থাপনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলো। 

ভক্তিবাদী আন্দোলনের উৎস ও উদ্ভবের কারন
ভক্তিবাদী আন্দোলনের উৎস ও উদ্ভবের কারন 


 (ক.) ভক্তিবাদের আদি উৎস ও সূচনা :- 

ভগবানের প্রতি ভক্তির ধারনা পৃথিবীর সব ধর্মেই পাওয়া যায়। হিন্দু ধর্মও তার ব্যতিক্রম নয়। হিন্দু ধর্মে "ভক্তিবাদের" প্রবনতা উপনিষদের যুগ (৭০০ - ৫০০ খ্রিঃ পূর্বাব্দ) থেকেই শুরু হয়েছিলো। ভক্তিবাদের মূল দর্শনের জন্মও উপনিষদে। উপনিষদ বা বেদান্তে বলা হয়েছিলো ঈশ্বর হলেন পরমাত্মা। তিনি নিরাকার ও পরমব্রহ্ম। আত্মা (যে আত্মা প্রত্যেক জীবের মধ্যে থাকে, যাকে জীবাত্মা বলা হয়) পরমাত্মারই অংশ বিশেষ। আত্মা বা জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন হলেই আসে মোক্ষ বা মুক্তি।

আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের জন্য প্রয়োজন ঈশ্বর সাধনা। হিন্দু ধর্মশাস্ত্রে ঈশ্বর লাভ বা মুক্তির জন্য ৩টি আধ্যাত্মিক মার্গ বা পথের কথা বলা হয়েছে। যথা - জ্ঞানযোগ, কর্মযোগ এবং ভক্তিযোগ। জ্ঞান যোগ বা জ্ঞান মার্গ হলো বিশুদ্ধ জ্ঞানের মাধ্যমে ঈশ্বরকে জানার পথ। কর্মযোগ বা কর্মমার্গ হলো নিষ্কাম (কর্মের ফলের চিন্তা না করে কর্ম সম্পাদন করা) সৎ কর্মের মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের প্রতি নিজেকে উৎসর্গ করা বা আত্মনিবেদন করা। আর ভক্তিযোগ বা ভক্তিমার্গ হলো ভক্তি ও ভালোবাসার মাধ্যমে ঈশ্বরের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে ঈশ্বর লাভ করা। 

ভাগবতগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জ্ঞান, কর্ম এবং ভক্তি - এই ৩ টি মার্গের কথা অর্জুনকে মহাভারতের যুদ্ধের আগে সবিস্তারে বুঝিয়েছিলেন। হিন্দুধর্মের তিন আধ্যাত্মিক মার্গের মধ্যে ভক্তিযোগকেই সর্বোত্তম এবং সবথেকে সহজবোধ্য মার্গ বলা হয়েছে। হিন্দুধর্মের ভক্তিমার্গ থেকেই ভক্তিবাদের জন্ম হয়। সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের নিকট Surrender বা আত্মসমর্পণ করে তাঁর ভজন, কীর্তন করাই হলো ভক্তিবাদের মূল কথা। ভাগবতগীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিষ্কাম কর্মের সাধনা এবং ভগবানের নিকট আত্মসমর্পনকেই মুক্তির পথ বলে ঘোষনা করেন। সেখানে শ্রীকৃষ্ণ বলেন, "সমস্ত ধর্ম ত্যাগ করে আমাকে অনুসরন করো, আমিই মুক্তির পথ নির্দেশ করবো।" 

ঋকবেদের যুগে ইন্দ্র, মিত্র, বরুন প্রভৃতি নানা দেবতাদের উদ্দেশ্যে যে স্তুতি বা মন্ত্রগুলি রচনা করা হয়েছিলো, সেখানে ভক্তিবাদই প্রাধান্য পেয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তী বৈদিক যুগের শেষদিকে আচার সর্বস্ব বৈদিক ধর্মের রূপান্তর ঘটে। এই সময় বৈদিক ধর্মের নানা আচার অনুষ্ঠান, পুজাপদ্ধতি এবং আর্য - অনার্য নানা লৌকিক বিশ্বাসকে অবলম্বন করে ব্রাহ্মন্যবাদী ধর্মের উদ্ভব ঘটে। উপনিষদের "ভক্তিবাদ" স্তিমিত হয়ে এই সময় ধর্মীয় ভাবনায় "আচরনবাদের" তীব্রতা দেখা যায়। এরই প্রতিক্রিয়া হিসাবে খ্রিঃ পূর্ব ষষ্ঠ শতকে বৈদিক ব্রাহ্মন্য ধর্ম বিরোধী ৬৩ টি প্রতিবাদী ধর্মের উদ্ভব ঘটে। এই প্রতিবাদী ধর্ম গুলির মধ্যে বৌদ্ধ ধর্ম ও জৈন ধর্ম কয়েক শতক পর্যন্ত ভারতের ধর্ম - সমাজ ও রাজনৈতিক ভাবনাকে আচ্ছাদিত করে রাখে। যে বৈদিক ধর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উত্থান ঘটেছিলো। কালের অমোঘ নিয়মে খ্রিঃ সপ্তম শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতে সেই বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের ধর্মের বিরুদ্ধেই ভক্তিবাদী আন্দোলনের উদ্ভব ঘটেছিলো।

যাইহোক, বৈদিক ব্রাহ্মন্য ধর্মের নতুন করে পুনরুত্থান ঘটে গুপ্তযুগে। "ব্রাহ্মন্য ধর্মের পুনরুজ্জীবনের যুগ" নামে পরিচিত গুপ্ত যুগের স্মৃতিশাস্ত্র প্রনেতাগন সর্বপ্রথম ব্রাহ্মন্য ধর্মকে "সনাতন ধর্ম" বলে অভিহিত করেন। খ্রিঃপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিঃ তৃতীয় শতকের মধ্যে ভারতে "পঞ্চোপাসনা" অর্থাৎ বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, সৌর ও গানপত্য ধর্মের উদ্ভব ঘটেছিলো। এই পাঁচটি ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে আচার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে নানা পার্থক্য ও বিরোধ থাকলেও, সবকটি ধর্মমতই ভক্তিবাদের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলো। 

বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, সৌর ও গানপত্য - এই পাঁচটি ধর্মসম্প্রদায় কালক্রমে একত্রিত হয়েই বর্তমান হিন্দুধর্মের রূপ লাভ করে। এদের একত্রীকরন শুরু হয় গুপ্তযুগে এবং তা পূর্নতা লাভ করে খ্রিঃ অষ্টম শতাব্দীতে। ভারতবর্ষে ইসলামের আগমনের ফলে সনাতনধর্ম বা ব্রাহ্মন্যবাদী ধর্ম যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে সেখান থেকে আত্মরক্ষার জন্য পঞ্চ উপাসক সম্প্রদায় নিজেদের পারস্পরিক বিরোধকে দূরে ঠেলে কাছাকাছি আসার ও সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলো। এইসময় আরবরাই সর্বপ্রথম সনাতন ধর্মে "হিন্দু" কথাটি ব্যবহার করে। পরবর্তীকালে মধ্যযুগে ইসলামের দুর্নিবার অভিঘাতে হিন্দু ধর্মের মধ্যে যে ক্ষত ও আঘাত নেমে এসেছিলো, তা থেকে জটিল আচারসর্বস্ব হিন্দু ধর্মকে সহজ, সরল ও সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য করে তোলার জন্যই মধ্যযুগে উদারনৈতিক সমন্বয়বাদী ভক্তিবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়।

উপনিষদের যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত সময়কালে বিভিন্ন ধারায় ও খাতে হিন্দুধর্মের যে ক্রমিক বিবর্তন দেখা যায়, তার মধ্যে নানা ত্রুটি ও ধর্মীয় আচার আচরণের বাহুল্য দেখা গেলেও, ভক্তিবাদী ভাবনা একেবারেই মুছে যায় নি। ভক্তিবাদ যেমন ভাগবত গীতায় দেখা যায়, তেমনি ভক্তিবাদী ভাবনার নানা সাক্ষ্যের প্রমান রামায়ন, মহাভারত, বিভিন্ন পুরান, ধর্মীয় সাহিত্য ও প্রত্নক্ষেত্র গুলিতে, বিশেষত ভাস্কর্য, মুদ্রা ও প্রাচীন লেখ গুলিতে পাওয়া যায়।

(খ.) মধ্যযুগে আন্দোলনরূপে "ভক্তিবাদ": প্রেক্ষাপট ও কারন 

মাথায় রাখতে হবে, ধ্রুপদী যুগ থেকেই (হিন্দু ধর্মে ধ্রুপদী যুগ ধরা হয় ২০০ খ্রিঃ পূর্বাব্দ থেকে ১১০০ খ্রিঃ পর্যন্ত সময়কালকে) হিন্দু বা সনাতন ধর্মের মধ্যে ভক্তিবাদের উল্লেখ থাকলেও, তা কখনই ধর্মীয় আচারবাদকে অতিক্রম করে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারে নি বা বৃহত্তর জনসমাজে ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলনেরও রূপ নিতে পারে নি। একমাত্র মধ্যযুগেই বিশেষত পনেরো - ষোলো শতকে "ভক্তিবাদ" একটি আন্দোলনের আকারে ভারতীয় উপমহাদেশে আছড়ে পড়েছিলো। কেন এমনটি হয়েছিলো, আরোও সুস্পষ্ট করে বলতে গেলে, ঠিক কি কারনে মধ্যযুগে "ভক্তিবাদ" একটি আন্দোলনের রূপ নেয়, তা নিয়ে অনেক ঐতিহাসিকই তাদের ভিন্ন ভিন্ন গবেষনালব্ধ মত ও বক্তব্য তুলে ধরেছেন। 

আমরা জানি, বহুবিধ কারনের সমন্বয়েই একটি ঐতিহাসিক ঘটনার জন্ম হয়। মধ্যযুগে ভক্তিবাদী আন্দোলনের উদ্ভবের ক্ষেত্রেও কারন ছিলো বহুবিধ। খুব সংক্ষেপে এই কারন গুলিকে আমরা নিন্মলিখিত ভাবে তুলে ধরতে পারি। 

(১.) ভক্তিবাদী দর্শনের উদ্ভব :- 

ভক্তিবাদী আন্দোলনকে সংঘবদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলো একাধিক ভক্তিবাদী দর্শন। দাক্ষিণাত্যে ভাগবত পুরান থেকেই ভক্তিবাদের বিকাশ ঘটেছিলো বলে ঐতিহাসিকরা মনে করেন। এছাড়াও বেদান্তের ৪ টি পৃথক ব্যাখ্যা ও পদ্ধতি নিয়ে যে মত ও পথ উঠে আসে, তাকে অবলম্বন করেও ভক্তিবাদ বিকশিত হয়। এগুলি হলো - আদি শঙ্করাচার্যের অদ্বৈতবাদ, রামানুজের বিশিষ্ট দ্বৈতাবাদ, নিম্বাকের দ্বৈতাদ্বৈতাবাদ এবং মাধবাচার্যের দ্বৈতাবাদ। বস্তুতপক্ষে দক্ষিন ভারতে ভক্তি আন্দোলন চলাকালীন সময়ে বেশ কয়েকজন ব্রাহ্মন পন্ডিত ও সাধক ভক্তি আন্দোলনের দার্শনিক ভিত্তি রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন - আদি শঙ্করাচার্য, রামানুজ, নিম্বাক, মাধবাচার্য প্রমুখ। এদের মাধ্যমেই দক্ষিন ভারতে শৈববৈষ্ণব ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটেছিলো। 

শঙ্করাচার্য :-  খ্রীষ্ট্রীয় নবম শতকে দক্ষিন ভারতের কেরালায় আবির্ভূত হন হিন্দুধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রচারক ও সংস্কারক আদি শঙ্করাচার্য। তিনি ছিলেন একদন্ডি সন্ন্যাসী বা দশনামী সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা।তিনি বেদান্তের অদ্বৈতবাদ তত্ত্ব প্রচার করে বলেন - আত্মা এবং পরমাত্মা অভিন্ন। একমাত্র ব্রহ্ম এবং পরমাত্মাই হলো সত্য। জগৎ মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ এবং মিথ্যা। শঙ্করের দার্শনিক মতাদর্শ ভারতবর্ষে এমন একদল সাধকের জন্ম দেয়, যারা ঈশ্বর সাধনায় ও ভক্তিবাদে বিহ্বল হয়ে সমস্ত সাংসারিক মায়া, মোহ ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়ে যান। 

শঙ্করাচার্যই বৌদ্ধ পরবর্তী যুগে আধুনিক হিন্দু ধর্মের কাঠামোর নির্মান করেন। হিন্দুধর্ম প্রতিস্থাপনের জন্য তিনি ভারতের চার প্রান্তে চারটি মঠের প্রতিষ্ঠা করেন। এগুলি হলো - দক্ষিনের কর্নাটকে শৃঙ্গেরী মঠ, পশ্চিমে গুজরাটের দ্বারকায় সারদা মঠ, পূর্বে ওড়িশার পুরীতে গোবর্ধন মঠ এবং উত্তরে উত্তরাখন্ডে যশীমঠ। এই চার মঠের অধ্যক্ষরা শঙ্করাচার্যের নামানুসারে "শঙ্করাচার্য" উপাধি গ্রহন করেন, যে ধারা আজও প্রবাহমান।

রামানুজ :- শঙ্করাচার্যের "মায়াবাদ" (ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা বা মায়ায় আবৃত) মানুষের মনের ধর্ম তৃষ্ণাকে পুরোপুরি ভাবে দূর করতে পারে নি। এরই ফলে শৈবধর্মের মায়াবাদের স্থলে বৈষ্ণব ধর্মের ভক্তিবাদী মতাদর্শের উদয় হয়। এই মতাদর্শ বৈষ্ণব ধর্মাচার্য নাথমুনি, যমুনাচার্য ও রামানুজের দ্বারা পরিচালিত হয়। 

একাদশ শতকে ভারতবর্ষে ভক্তিধর্মের আদি প্রচারক ছিলেন রামানুজ। তিনি নাথমুনি প্রতিষ্ঠিত শ্রীবৈষ্ণব ধর্মমতের প্রচারক ছিলেন। খ্রিষ্ট্রীয় একাদশ শতাব্দীতে তিনি কাঞ্চীশ্রীরঙ্গমকে তাঁর ভক্তিধর্ম প্রচারের কেন্দ্র করেন। তাঁর পূর্ব নাম ছিলো শ্রীলক্ষন দেশিক। রামানুজ শঙ্করের অদ্বৈতবাদকে খন্ডন করে "বিশিষ্ট দ্বৈতবাদের" তত্ত্ব প্রচার করে বলেন, জগত ব্রহ্ম বা পরমাত্মা থেকে আলাদা বা পৃথক নয়, আবার মিথ্যাও নয়। তাঁর মতে, ব্রহ্মই জগতে পরিনত হয়েছে। কিন্তু জগত ব্রহ্ম নয়। যেমন মাকড়সা তার জাল থেকে পৃথক নয়, মাকড়সার দেহের একটি অংশই জাল রূপে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু সেই জালই মাকড়সা নয়।

রামানুজ তাঁর তত্ত্বের মধ্য দিয়ে জীব ও ব্রহ্মের (অর্থাৎ ঈশ্বরের) একাত্ম হয়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরেন। সকল জীব পরম ব্রহ্মের অংশ থেকে উদগত এই দার্শনিক মতবাদ থেকে রামানুজ নিন্মবর্গীয় অচ্ছুতদেরও তাঁর শিষ্য রূপে গ্রহন করেন। শ্রীবৈষ্ণবরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণকেই পরমব্রহ্ম বলে প্রচার করেন। রামানুজ তাঁর বিশিষ্টদ্বৈতাবাদের সমর্থনে তামিলনাড়ু থেকে কর্নাটকের নানা স্থানে প্রচার চালান। এছাড়াও "গীতভাষ্য বেদান্তসার", "বেদার্থ সংগ্রহ", বেদান্তদীপ" রচনা করেন। রামানুজের শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রামানন্দ। রামানন্দই দক্ষিন ভারত থেকে ভক্তিবাদের ধারাকে উত্তর ভারতে বহন করে নিয়ে আসেন এবং উত্তর ভারতে ভক্তি আন্দোলনকে জলোচ্ছ্বাসে পরিনত করেন। তাঁর কাছ থেকেই ভক্তিবাদী আন্দোলনের দুটি প্রধান ধারা তাঁর প্রিয় শিষ্য কবীর এবং তুলসীদাসের মাধ্যমে জন্মলাভ করে।

নিম্বার্ক :- রামানুজের পরবর্তীকালে দ্বাদশ শতকে অন্ধ্রপ্রদেশের বেলারি জেলার এক তেলেগু ব্রাহ্মন পরিবারে জন্মগ্রহন করেন বৈষ্ণব সাধক নিম্বার্ক। তিনি তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময় বৃন্দাবনেই কাটান। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বৈষ্ণব সম্প্রদায়কে বলা হয় সনক সম্প্রদায়। নিম্বার্ক ভক্ত ও ভগবানের পৃথক উপস্থিতিকে তুলে ধরতে দ্বৈতাদ্বৈতবাদ তত্ত্ব প্রচার করেন। দ্বৈতাদ্বৈতবাদ তত্ত্ব অনুসারে ব্রহ্ম ( ঈশ্বর/পরমব্রহ্ম) এবং আত্মা (জগত) এক হলেও, একই সাথে তারা ভিন্নও। 

নিজ ধর্মমত প্রচারের জন্য নিম্বার্ক বেদান্ত "পরিজাত সৌরভ" রচনা করেন। নিম্বার্ক সম্প্রদায় প্রপত্তি মার্গের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন, যার মূল কথা হলো ঈশ্বর নিজ করুনা ও মহিমায় ভক্তকে দেখবেন।

মাধবাচার্য :- ত্রয়োদশ শতকে দক্ষিণ ভারতের ভক্তিবাদী মতাদর্শের আরেকজন প্রখ্যাত পন্ডিত ছিলেন মাধবাচার্য। তিনি পুন্যপ্রজ্ঞা বা আনন্দতীর্থ নামেও পরিচিত ছিলেন। প্রথম জীবনে শৈব থাকলেও, পরে তিনি বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হন। মাধবাচার্য ছিলেন বেদান্তের দ্বৈতবাদের মুখ্য প্রবক্তা। দ্বৈতবাদ বলতে দুটি আলাদা বা ভিন্ন সত্ত্বাকে বোঝায় । মাধবাচার্যের মত অনুসারে ব্রহ্ম অর্থাৎ ঈশ্বর এবং জগৎ দুটি পৃথক সত্ত্বা। তাঁর মতে এই বিশ্বের প্রত্যেক পরমানুতেই প্রান আছে, অর্থাৎ প্রত্যেক পরমানুই জীব। 

মাধবাচার্যের লেখা সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য একটি গ্রন্থ ছিলো - "সর্বদর্শনসংগ্রহ"। মাধবাচার্যের অনুগামী সম্প্রদায় "ব্রহ্ম সম্প্রদায়" নামে পরিচিত ছিলো।

(২.) দক্ষিণ ভারতে ভক্তিবাদী শৈব ও বৈষ্ণব আন্দোলনের ধারা :-  

দক্ষিন ও উত্তর ভারতে ভক্তিবাদী আন্দোলনের প্রচারে ও বিকাশে শৈব ও বৈষ্ণব আন্দোলনের বিভিন্ন ধারা বা সম্প্রদায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলো। এদের মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য ছিলো শৈব নায়নারবৈষ্ণব আলওয়ার সম্প্রদায়।

(অ.) বিভিন্ন শৈব সম্প্রদায় :- 

ভগবান শিবকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ ভারতে প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন শৈব সম্প্রদায় ও শৈব মতবাদের উদ্ভব ঘটেছিলো। যেমন - পাশুপত সম্প্রদায়, নায়নার সম্প্রদায়, লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়, শৈব সিদ্ধান্ত বা তামিল শৈব ধর্ম, আগমান্ত শৈব ধর্ম, কালামুখ সম্প্রদায় ইত্যাদি। শৈব ধর্মের এই শাখা সম্প্রদায় গুলির মধ্যে দক্ষিণ ভারতে ভক্তিবাদের প্রচারে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলো - (i.) লিঙ্গায়েত সম্প্রদায় ও (ii.) নায়নার সম্প্রদায়।

(i.) লিঙ্গায়েত সম্প্রদায় :- শৈব ধর্মের অন্যতম প্রধান শাখা ছিলো লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়। এই ধর্ম সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কর্নাটকের কলচুরি রাজ্যের মন্ত্রী আচার্য বাসবন্না। তিনি বহু পুরানো ঐতিহ্যবাহী লিঙ্গায়েত ধর্মকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপ দেন। তিনি ১৫ হাজার বচন রচনা করেন এবং ১১৬০ খ্রিঃ "শিবানুভব মন্ডপ" নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর অনুগামীরা কন্ঠে ইষ্টলিঙ্গ ধারন করতেন বলে তাদের বলা হতো লিঙ্গায়েত। আবার তাঁরা বেদান্তের চর্চা করে আধ্যাত্মিক আনন্দ লাভ করতো বলে তাদের বীর শৈবও বলা হতো।

আচার্য বাসব তাঁর প্রচারিত ধর্মমতে শিবের প্রেমময় ভক্তির ওপর সবথেকে বেশি গুরুত্ব দেন। তিনি তাঁর ধর্মমতে জাতপাত,অস্পৃশ্যতা, নারী পুরুষে ভেদ, মূর্তিপুজা, মন্দির তৈরি, বাল্যবিবাহ ও জন্মান্তরবাদের বিরোধিতা করেন। প্রচলিত ধর্মীয় নীতি ও সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বাসবন্নার প্রতিবাদী মানসিকতার জন্য ঐতিহাসিক এইচ কে শাস্ত্রী তাঁকে "দক্ষিণ ভারতের মার্টিন লুথার" বলে অভিহিত করেছেন। 

লিঙ্গায়েতরা শবদেহকে দাহ করার পরিবর্তে সমাধিস্থ বা কবর দেওয়াতে বিশ্বাসী ছিলো।

(ii.) নায়নার সম্প্রদায় :- নায়নার শব্দের অর্থ হলো শিবের শিকারি কুকুর বা শৈব ধর্মের শিক্ষক। নায়নাররা ছিলো তামিলনাড়ুর একটি শৈব সাধক সম্প্রদায়। এরা তামিল ভাষায় ভক্তিমূলক স্তবগান গেয়ে ভক্তিবাদের প্রচার করতেন। নায়নারদের ভক্তিমূলক শিবস্তোস্ত্র গুলিকে বলা হতো "তেভরাম", যা "তামিল বেদ" নামে পরিচিত ছিলো। "তেভরাম" (শিবস্তোস্ত্র) গুলিকে "তিরুমুরাই" গ্রন্থে সংকলন করেন শৈব ধর্মগুরু নম্বি - আন্ডার - নম্বি

তামিল মহাকাব্য তেভরম অনুসারে নায়নার সম্প্রদায়ের ৬৩ জন সন্তের নাম পাওয়া যায়। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন - আপ্পার, সুন্দরার, মানিক ভসোগর, সম্বন্দর। নায়নার সম্প্রদায়ের একজন মহিলা সাধিকা ছিলেন - করাইক্কাল আম্মাইয়ার। নায়নাররা লিঙ্গায়েতদের মতোই জাতিভেদ প্রথা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরোধিতা করেছিলেন।

(আ.) বিভিন্ন বৈষ্ণব সম্প্রদায় :- 

খ্রিস্টপূর্ব কাল থেকেই ভারতবর্ষে ভাগবত বা বৈষ্ণব ধর্মের ঐতিহ্য ছিলো। যদিও খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের আগে ভারতে ভাগবত বা বৈষ্ণব ধর্ম বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে নি। প্রথমদিকে মথুরা ও বিদিশা (মধ্যভারত) অঞ্চলের মধ্যেই বৈষ্ণব ধর্ম সীমাবদ্ধ ছিলো। বলা বাহুল্য, গুপ্ত যুগের আগেও বৈষ্ণব নামটির কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না। গুপ্ত যুগ থেকে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার ফলে বৈষ্ণব ধর্মের দ্রুত প্রসার ঘটে। গুপ্ত বা গুপ্ত পরবর্তী যুগ থেকে বৈষ্ণব ধর্মে অবতার পুজার গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। শ্রীবিষ্ণুর অবতার হিসাবে রামচন্দ্র বা শ্রীকৃষ্ণের বিশেষ প্রাধান্য ও গুরুত্ব এই সময় থেকেই লক্ষ্য করা যেতে থাকে। 

খ্রিঃ সপ্তম শতাব্দী থেকে দক্ষিণ ভারতে বৈষ্ণববাদ বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। খ্রিঃ নবম শতকে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুতে বৈষ্ণবধর্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। একাদশ শতকের মধ্যে তামিলনাড়ু থেকে কর্নাটকে বৈষ্ণব ধর্ম প্রসারলাভ করেছিলো। দ্বাদশ শতকের মধ্যে বিখ্যাত সাধক রামানুজ তাঁর শিষ্যদের মাধ্যমে এটিকে উত্তর ভারতে প্রসারিত করেন।

দক্ষিণ ভারতে বৈষ্ণবরা নানা সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিলো। যথা - আলওয়ার সম্প্রদায়, রামানুজের শ্রীবৈষ্ণব সম্প্রদায়, নিম্বার্কের সনক সম্প্রদায়, মাধবাচার্যের ব্রহ্ম সম্প্রদায়, বিঠলনাথের রুদ্র সম্প্রদায় ইত্যাদি। বৈষম ধর্মের সবকটি সম্প্রদায়ই ভক্তিবাদের প্রচারে কমবেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলো। তবে এদের মধ্যে আলওয়ারদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।

আলওয়ার সম্প্রদায় :- বিষ্ণুর উপাসক আলওয়ারদের কথা জানা যায় তামিল কাব্যসংকলন "নলরিয়া দিব্য প্রবন্ধম" থেকে। এই কাব্যগ্রন্থ থেকে জানা যায়, খ্রিঃ ষষ্ঠ থেকে নবম শতকের মধ্যে ১২ জন আলওয়ার সাধক দক্ষিন ভারতে ভক্তিবাদের প্রচার করেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন - পেইগাই, পেআলভার, অন্ডাল, কুলশেখর।এদের মধ্যে অন্ডাল ছিলেন একমাত্র মহিলা সাধিকা

আলওয়াররা বিশ্বাস করতেন, বিষ্ণু সর্বত্র বিরাজমান ও সর্বশক্তিমান। তাঁকে ভক্তিভরে ডাকলে তাঁর সাড়া পাওয়া যায়। আলওয়াররা মানুষে মানুষে ভেদাভেদ মানতেন না। 

কালক্রমে বৈষ্ণববাদের ধারা দক্ষিণ ভারত থেকে ভারতের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলায় শ্রীচৈতন্যদেব এবং আসামে শঙ্করদেব বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার করেন। জগন্নাথদেবকে কেন্দ্র করে ঊড়িষ্যায় জগন্নাথ মতবাদ গড়ে ওঠে। দ্বাদশ শতকে রামানুজের প্রচেষ্টায় জগন্নাথদেব বিষ্ণুরূপে পূজিত হতে থাকেন। দ্বাদশ শতকের শেষদিকে মহারাষ্ট্রে জ্ঞানদেবের হাত ধরে বারকরী (যার অর্থ তীর্থযাত্রা) মতবাদ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁর নেতৃত্বে মহারাষ্ট্রের পান্থারপুরের বিঠোভা (বিষ্ণু) মন্দিরকে কেন্দ্র করে বারকরী বৈষ্ণববাদ ভক্তি আন্দোলন গড়ে ওঠে। জ্ঞানদেবের পর নামদেব, তুকারাম ও রামদাস এই আন্দোলনের ধারাকে বজায় রাখেন। মহারাষ্ট্রের বারকরী সন্তদের উত্থান এবং ঊড়িষ্যা ও পূর্ব ভারতে আন্দোলনের উদ্ভব ভক্তি আন্দোলনের উত্তরমুখী যাত্রাকে ত্বরান্বিত করে।

এইভাবে দেখা যায়, সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে শৈব ও বৈষ্ণব সাধকদের নেতৃত্বে দক্ষিন ভারতে ভক্তিবাদের সূচনা ও প্রসার ঘটে। পরে এই ভক্তিবাদী আন্দোলন ঢেউ চতুর্দশ - পঞ্চদশ শতক নাগাদ উত্তর - পূর্ব ভারতে আছড়ে পড়ে নানক, কবীর, দাদু দয়াল, মীরাবাঈ, শঙ্করদেব, শ্রীচৈতন্যদেব প্রমুখ একাধিক সাধকের নেতৃত্বে।

(৩.) আদি মধ্যযুগে রাজপুত - ব্রাহ্মন জোটের প্রভাব ও অবক্ষয়  :-  

সপ্তম শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতে যখন ভক্তিবাদী আন্দোলনের সূচনা হয়, ঠিক তখন উত্তর ভারতে একবিরাট রাজনৈতিক পালাবদল দেখা যায়। হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর উত্তর ভারতে রাষ্ট্রব্যবস্থায় ভাঙ্গন দেখা যায়। এই সময় আর্থ - সামাজিক ক্ষেত্রে সামন্ততান্ত্রিকতার প্রবনতা দেখা যায়। ব্যবসা বাণিজ্য ও নাগরিক জীবনে অবক্ষয় দেখা যায়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিকেন্দ্রীকরণ ও অস্থিরতা দেখা যায়। এই সময়ে. রাজনৈতিক শক্তির শূন্যতার সুযোগ নিয়ে রাজপুত জাতির উত্থান সামাজিক ক্ষেত্রে নতুন সমিকরন ঘটায়।

প্রতিবাদী ধর্ম আন্দোলন বিশেষত বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম ব্রাহ্মন্যবাদের ওপর যে চাপ সৃষ্টি করেছিলো, আদিমধ্য যুগে রাজপুতদের উত্থানের ফলে তা অনেকটাই কেটে যায়। সুপ্রাচীন কাল থেকেই রাজানুগ্রহের ছত্রছায়ায় থেকে ব্রাহ্মন্যবাদ লালিত ও পরিপুষ্ট হয়ে এসেছিলো। রাজপুত জাতির উত্থানের ফলে উত্তরভারতীয় ব্রাহ্মন্যবাদ রাজপুত - ছত্রছায়ায় রাজানুগ্রহের সুযোগ লাভ করে।

আদিমধ্য যুগে ক্ষত্রিয়দের স্থান নেয় রাজপুতগোষ্ঠী। ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় বর্নসংকর ও উপবর্ন হিসাবে রাজপুতদের উত্থান ঘটেছিলো, যা ব্রাহ্মন্যবাদী চতুঃবর্ন সমাজ কাঠামোর বিরোধী ছিলো। রাজপুতরা বৃত্তি হিসাবে যুদ্ধকে বেছে নেয় এবং সামাজিক মর্যদা ও জমির স্বত্ত্ব লাভের জন্য তৎপরতা দেখায়। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় ব্রাহ্মনদের প্রভাব প্রতিপত্তি বিষয়ে রাজপুতদের সম্যক ধারনা ছিলো। এই সময় নিজেদের সামাজিক অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য রাজপুতরা ব্রাহ্মনদের প্রতি প্রয়োজনভিত্তিক আনুগত্য প্রদর্শন করতে থাকে। তারা নিজেদের "গো ব্রাহ্মন প্রতিপালক" হিসাবে তুলে ধরে।

এইসময় নিজেদের সামাজিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার তাগিদে ব্রাহ্মনশ্রেনী রাজপুতদের ক্ষত্রিয় স্বীকৃতি দিয়ে চতুঃবর্ন কাঠামোর মধ্যে তাদের অন্তর্ভূক্ত করে নেয় এবং রাজপুরোহিত সহ বহুবিধ রাজকীয় অনুকম্পা লাভ করে। এইভাবে আদি মধ্য যুগে রাজপুত - ব্রাহ্মনদের মধ্যে একটি আপোস বোঝাপড়া গড়ে ওঠে। বর্নসংকর জাতপুতরা ব্রাহ্মন্যবাদের সমর্থন লাভের জন্য হিন্দুত্ববাদের চরমপন্থাকে অবলম্বন করে নিজেদের হিন্দুত্ববাদের রক্ষক ও প্রতিপালক হিসাবে তুলে ধরে।

এর ফলে আদিমধ্য যুগে ব্রাহ্মন - রাজপুত ক্ষত্রিয়দের বোঝাপড়ায় গড়ে ওঠা সমাজ ব্যবস্থায় অ - বর্ন বা নিন্মবর্গের মানুষদের ওপর ব্রাহ্মন্যবাদের ধর্মীয় ও সামাজিক বিধিনিষেধের নানা বোঝা ক্রমে ক্রমে অত্যাচারের পর্যায়ে নেমে আসে। ইসলাম আগমনের ফলে এই সামাজিক অত্যাচারের দ্বিমুখী ফলাফল দেখা যায়। প্রথমত, ব্রাহ্মন্যবাদী সমাজব্যবস্থায় ক্ষুব্ধ ও অত্যাচারিত হিন্দু নিন্মবর্গীয় শ্রেনীর একটি বড়ো অংশ ব্রাহ্মন্যবাদী হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে এইসময় দলে দলে ইসলাম গ্রহনের জন্য ঝুঁকে পড়ে। ইসলাম গ্রহন বা বলপূর্বক ধর্মান্তকরনের ফলে এই সময় উত্তর ভারতে হিন্দু ধর্ম বিশেষ সংকটের মধ্যে পড়ে। দ্বিতীয়ত, ব্রাহ্মন্যবাদী সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে দীর্ঘ পুঞ্জীভূত ক্ষোভ উত্তর ভারতে ভক্তিবাদ প্রচারে বিশেষ সহায়ক হয়। উত্তর ভারত সহ ভারতের বিস্তীর্ণ অংশে ব্রাহ্মন্যতন্ত্র বা হিন্দু বহুশ্বরবাদের প্রতিবাদে অব্রাহ্মনদের নেতৃত্বে ভক্তিবাদের ধারা জনপ্রিয়তা লাভ করে।

একাদশ থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যে ভারতে মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামের দ্রুত প্রসার পরোক্ষভাবে ভক্তিবাদের উত্থানকে ত্বরান্বিত করে। হিন্দুত্ববাদে মন্দির এবং ব্রাহ্মন দ্বারা দেবমূর্তির ঈশ্বর আরাধনা - দুটি অপরিহার্য বিষয় হিসাবে পরিগনিত হয়। কিন্তু ইসলামের আগমনের ফলে একদিকে তুর্কি যোদ্ধাদের সঙ্গে বিভিন্ন রনাঙ্গনে রাজপুতদের পরাজয়, অন্যদিকে তুর্কিদের নির্বিচারে  মন্দির, দেবমূর্তি ধ্বংস এবং ব্রাহ্মন হত্যা - রাজপুত - ব্রাহ্মন জোটকে শুধু ভেঙ্গেই দেয় নি, ব্রাহ্মন্যবাদী সমাজব্যবস্থা, মূর্তিপুজার যৌক্তিকতা ইত্যাদি বিষয়েও নানা প্রশ্ন তুলে দেয়। শুধু তাই নয়, এর ফলে ব্রাহ্মন্যতন্ত্রের বিরুদ্ধে মানুষের যাবতীয় ভীতি ও মোহের ভঙ্গ ঘটে।

মনে রাখতে হবে, ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থায় ব্রাহ্মন্যতন্ত্র ছিলো অত্যন্ত ক্ষমতাশালী। তাকে রুষ্ট বা উপেক্ষা করে কোন ধার্মিক বা সামাজিক পরিবর্তন করা কার্যত অসম্ভব ছিলো। কিন্তু মধ্যযুগে অনুকূল পরিবেশ এই অসম্ভবকেই সম্ভব করে তোলে। এইসময় একদিকে রাজপুতদের পরাজয়, অন্যদিকে তুর্কিদের আক্রমণ, মন্দির লুন্ঠন, নির্বিচারে দেববিগ্রহ ভেঙ্গে ফেলা ব্রাহ্মনদের আর্থিক ক্ষতির কারন হয়। ভারতে তুর্কিদের বিজয় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি মন্দিরের সম্পদ থেকেও ব্রাহ্মনদের বঞ্চিত করে। ব্রাহ্মনরা দীর্ঘকাল ধরে মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন যে মন্দিরে কেবল দেবতা অধিষ্ঠান করেন না, তা ছিলো বিশেষ দৈব ক্ষমতার কেন্দ্রস্বরূপ। তুর্কিদের বিনা বাধায় নির্বিচারে একের পর এক মন্দির ধ্বংস ব্রাহ্মন্যবাদী ধর্মীয় বিশ্বাসকে তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে দেয়।

এর ফলে ব্রাহ্মনরা জাগতিক ও আদর্শগত দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলো। উদ্ভব হয়েছিলো জাতপাত ও ব্রাহ্মন বিরোধী এক আদর্শের। এই প্রেক্ষাপট "ব্রাহ্মন্যবাদী জাত - বর্নব্যবস্থা" ও "মন্দির কেন্দ্রীক ধর্ম ব্যবস্থার" বিরোধী ভক্তিবাদী আন্দোলনের উদ্ভব, বিকাশ ও প্রসারের বিশেষ সহায়ক হয়।তবে ত্রয়োদশ শতকের প্রথম তিন দশকের মধ্যে উত্তর ভারতে তুর্কি শাসন স্থাপিত হলেও, ভক্তি আন্দোলনকে প্রত্যক্ষ করার জন্য উত্তর ভারতকে পনেরো শতক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিলো। এর কারন ছিলো ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত মধ্যবর্তীকালটি ছিলো অস্থিরতার সময়। এই সময়ে নানা যুদ্ধবিগ্রহ, হিংসাত্মক ঘটনা, মোঙ্গল আক্রমন, রাজপুতদের প্রতিরোধী আন্দোলন, বিধর্মীদের প্রতি ঘৃনা ও আক্রমন ইত্যাদির ফলে সমাজ ছিলো অস্থিতিশীল। এরূপ পরিবেশ ভক্তি আন্দোলনের মতো একটি আধ্যাত্মিক আন্দোলনের বিকাশে বাধার সৃষ্টি করেছিলো।

(৪.) সমন্বয়বাদী রাষ্ট্রীয় ধারা ও সংস্কৃতির প্রভাব :-

 তুর্কিদের আগমনের ফলে ব্রাহ্মনদের সামাজিক কর্তৃত্বের অবসান ঘটে। ব্রাহ্মন্যবাদ রাজশক্তির অনুগ্রহ থেকেও বঞ্চিত হয়। ব্রাহ্মন্যবাদ দুর্বল হয়ে যাওয়ার ফলে সুলতানি আমলে এক মিশ্র সামাজিক কাঠামো ও সংস্কৃতির জন্ম হয়। হিন্দু - মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক ঘৃনার অবসান ঘটে। যদিও এই সময় হিন্দু এবং মুসলিম সমাজের ভিতর ব্রাহ্মন ও মৌলবীরা দুই সম্প্রদায়ের মানুষদের মধ্যে ঘৃনা ও বিদ্বেষ প্রচারের কাজটি চালিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু এই কাজে তারা খুব বেশি সাফল্য লাভ করতে পারেন নি। 

সুলতানি শাসনের শুরু থেকেই ইমাম মৌলবীরা সুলতানদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে তাদের মন্দির ধ্বংস এবং অমুসলিম এলাকায় আক্রমনের জন্য প্রলুব্ধ করতেন। অনেক সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সুলতানরা এটি করলেও, বেশিরভাগ সময়েই তারা ইমাম, উলেমাদের অস্বীকার করেই সুলতানি শাসন চালান। বাস্তববাদী সুলতানরা উপলব্ধি করেছিলেন, ভারতের বৃহত্তম হিন্দু জনসমাজকে চটিয়ে কখনই দীর্ঘদিন সংখ্যালঘু মুসলিমদের পক্ষে ক্ষমতায় থাকা সম্ভব হবে না। সুলতানদের এই নীতি ভারতে হিন্দু - মুসলিম মিলনের পথকে প্রশস্ত করেছিলো।

সুলতানি যুগে হিন্দু - মুসলিম পাশপাশি অবস্থানের ফলে ধীরে ধীরে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগসূত্র স্থাপিত হয়, যা উভয় সংস্কৃতির মধ্যে মিলনের পথ প্রশস্ত করে। তৈরি হয় এক নতুন সমন্বয়বাদী সংস্কৃতি। খুব শ্লথ ও ধীর গতিতে এই সমন্বয় ঘটতে থাকে ধর্ম, সমাজ, ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, শিল্প প্রভৃতি নানা ক্ষেত্রে। এইসময় সরকারি কাজে নিযুক্ত হিন্দুরা মুসলিমদের পোশাক ও আদব কায়দা অনুকরন করতে শুরু করে। মুসলিম রাজদরবারের আদব কায়দা অনেক হিন্দু রাজারা অনুকরন করতে থাকেন। পাশাপাশি হিন্দুদের সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের প্রথা গুলি মুসলিম সমাজও অনুকরন করতে থাকে। ক্রমে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্কও স্থাপিত হতে শুরু করে। আমির খসরুর রচনা থেকে জানা যায়, আলাউদ্দিন খলজির পুত্র খিজির খানের সঙ্গে দেওগিরের সরলাদেবীর বিবাহ এক রোমান্টিক মাত্রা লাভ করেছিলো।

দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমন্বয় থেকে বাংলায় সত্যপির, মানিকপির ও শিতলাপুজার প্রচলন ঘটে। হিন্দু - মুসলিম সংস্কৃতির সমন্বয়ে উত্তর - পশ্চিম ভারতে উর্দু ভাষার সৃষ্টি হয়। হিন্দু ও মুসলিমরা দুইটি ভিন্ন ভাষায় কথা বলার ফলে তাদের মধ্যে ভাববিনিময়ের যে অসুবিধা সৃষ্টি হয়, তা দূর করার জন্য এইসময় ফারসি ও তুর্কি ভাষার সঙ্গে হিন্দি ভাষার সংমিশ্রনে উর্দু ভাষার সৃষ্টি হয়। অনেক হিন্দু যেমন এই সময় ফার্সি ভাষা শিখতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, তেমনি বহু সংস্কৃত গ্রন্থ এইসময় ফারসিতে অনুবাদ করা হতে থাকে। এইভাবে হিন্দু - মুসলিম সংস্কৃতির মধ্যে একটি যোগসূত্র স্থাপিত হয়।

হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির সমন্বয়ে এইসময়ে যে মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম হয় তাকে লালিত করে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেন বেশ কিছু উদারপন্থী মুসলিম শাসক। যাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন - "বাংলার আকবর" নামে খ্যাত হুসেন শাহ, "কাশ্মীরের আকবর" নামে খ্যাত জয়নুল আবেদিন এবং "জগৎগুরু" নামে খ্যাত বিজাপুরের সুলতান ইউসুফ আদিল শাহ। 

মধ্যযুগের উদার সমন্বয়বাদী সংস্কৃতি মুসলিম রাষ্ট্রশক্তিকে কোন বিপর্যয়ের মুখে ফেলে নি, বরং তাকে অনেক বেশি মানবিক ও সুদৃঢ় করে তুলতে সাহায্য করেছিলো। এটি পরোক্ষে ভক্তিবাদী আন্দোলনের পথকেও প্রশস্ত করেছিলো। উদার সমন্বয়বাদী সাংস্কৃতিক ধারার কারনেই ভক্তিবাদী প্রচারকরা কোন রাষ্ট্রীয় বাধার সম্মুখীন না হয়েই নির্বিঘ্নে ভক্তিবাদ প্রচারের সুযোগ লাভ করেন। উদার সংস্কৃতির প্রভাবে মুসলিম শাসকরা হিন্দু ভক্তিবাদী আন্দোলনকে কখনই ইসলাম বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখেন নি বা মাপেন নি। এককথায় সমন্বয়বাদী রাষ্ট্রীয় ধারা ও সংস্কৃতি ব্রাহ্মন্যবাদী চতুঃবর্ন ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থার বদলে যে মিশ্র সংস্কৃতি ও সমাজ ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা করে, তাই উত্তর ভারতে ভক্তিবাদ প্রচারের এক উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছিলো।

(৫.) ইসলাম ও সুফিবাদের পরোক্ষ প্রভাব :- 

মধ্যকালীন ভারতে ভক্তিবাদের বিকাশে ড. তারাচাঁদ, ইউসুফ হুসেন, ড. কুরেশির মতো অনেক ঐতিহাসিকই ইসলামের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবের কথা তুলে ধরেন। অধ্যাপক হুসেন ভারতের ভক্তি আন্দোলনকে দুটি পর্বে ভাগ করেছেন। প্রথম পর্বটির পরিধি ছিলো শ্রীমদ্ভাগবতগীতার সময় থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত । এই পর্যায়ে ভক্তি আন্দোলন মূলত দক্ষিন ভারতে আবদ্ধ ছিলো এবং এইসময়ের ধর্মভাবনায় মুষ্টিমেয় একেশ্বরবাদের সাথে সংখ্যা গরিষ্ঠ সাধারন মানুষের বহু ঈশ্বরবাদের এক সংমিশ্রন লক্ষ্য করা যায়। 

ভক্তি আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্বটির পরিধি ছিলো ত্রয়োদশ শতক থেকে ষোড়শ শতক পর্যন্ত। এই সময়ে ভারতের অভ্যন্তরে ইসলামের ব্যাপক প্রচার ঘটেছিলো। ইসলামের প্রচার একদিকে যেমন রাজপুত - ব্রাহ্মন জোটে ফাটল সৃষ্টি করে হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মন্যবাদকে দুর্বল করে দেয়। তেমনি ইসলামে ধর্মীয় ক্ষেত্রে অনাড়ম্বতা, সহজ সরল উপাসনা পদ্ধতি, একেশ্বরবাদ ও আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের ভাবনা, ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবতাবাদ, সামাজিক সাম্যের তত্ত্ব জাতি, বর্নে বহুধাবিভক্ত হিন্দু সংস্কারক ও ভক্তিবাদী সাধকদের গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ ও প্রভাবিত করে। 

ইসলামের আগমনের পর এমনিতেই বহু নিন্মবর্গীয় হিন্দু ইসলাম দ্বারা আকৃষ্ট, ধর্মান্তরিত ও প্রভাবিত হন। ভক্তিবাদী সাধকরা তাই ইসলামের ধর্মীয় ভাবধারা ও আদর্শকে গ্রহন করে হিন্দুধর্মকে মন্দির - মূর্তি - পুরোহিত বর্জিত করে সহজ, সরল, অনাড়ম্বড়, একেশ্বরবাদী ঢঙে নবরূপ প্রদানের চেষ্টা করেন। এর মাধ্যমে একদিকে হিন্দুধর্মকে যেমন উদার ও ইসলামের সমকক্ষ হিসাবে গড়ে তুলে এর ক্ষয় প্রতিরোধ করা হয়, তেমনি অন্যদিকে অহিন্দুদের কাছে ইসলামের দুর্বিবার আকর্ষনও অনেকটা ম্লান করে দেওয়ার প্রচেষ্টা করা হয়। এর উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, বাংলায় শ্রীচৈতন্যদেবের আগমন ও ভক্তিবাদী বৈষ্ণব ধর্মের জোয়ার বাংলায় ইসলামের বিজয়রথ ও ধর্মান্তকরনকে অনেকটাই আটকে দেয়। ভক্তিবাদী সাধকদের প্রচেষ্টায় বহু হিন্দু নানা আর্থ - সামাজিক অত্যাচার ও মুসলিম নির্যাতনের পরেও হিন্দুধর্মে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।

ভক্তিবাদের বিকাশে ইসলামী সুফি সন্তদের অবদানও বিশেষ গুরুত্বপূর্ন ছিলো বলে মনে করা হয়। ইসলাম ধর্মে উলেমারা ধর্ম সমন্বয়ের বিরোধী ছিলেন। তারা সবসময় আপোষ বিরোধী কোরানীয় মত প্রচার করতেন। কিন্তু সুফিরা কোরানের পন্ডিতী ব্যাখ্যা উপেক্ষা করে আল্লার প্রতি ভক্তিকেই মুক্তির একমাত্র পথ বলে বিশ্বাস ও প্রচার করতেন। ইসলামের আচরনবাদকে গুরুত্ব না দিয়ে তারা ভক্তিবাদ, মানবতাবাদ ও হিন্দু - মুসলিম সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন। ইসলাম ধর্মের ব্রাহ্মন রূপে পরিগনিত উলেমা, ইমামদের উপেক্ষা করে এবং কোরানের গোড়া আচরনবাদকে উপেক্ষা করে সুফি সন্তদের ধর্মপ্রচার পরোক্ষে ভক্তিবাদের সাধকদেরও প্রভাবিত করে। সুফিদের মতো তাঁরাও গোড়া হিন্দুত্ববাদের প্রতীক মন্দির, পৌত্তলিকতা ও ব্রাহ্মন্যবাদকে উপেক্ষা ও অস্বীকার করেই ভক্তিবাদ প্রচার করেন। সুফি এবং ভক্তিবাদী দুই সাধকরাই ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে প্রেমময় সম্পর্ক এবং গুরুবাদের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলো। দুই মতবাদকেই সমাজের নিন্মবর্গের মানুষ সাদরে গ্রহন করে। 

(৬.) ভক্তিবাদের আর্থ - সামাজিক প্রেক্ষাপট :- 

পৃথিবীর যেকোন দেশে যেকোন সময়ে ধর্ম আন্দোলনের ক্ষেত্রে আর্থ - সামাজিক প্রেক্ষাপট একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে থাকে। মধ্যযুগের ভক্তিবাদী আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। আদিমধ্যযুগে উত্তরভারতে ব্রাহ্মন্যবাদী অনুশাসনের কঠোরতার ফলে সমাজে জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার কঠোরতা বৃদ্ধি পেয়েছিলো। হিন্দুধর্মের মধ্যে নানা কুসংস্কার এই সময়ের সমাজ জীবনকে পঙ্গু করে দিয়েছিলো। সমাজে দরিদ্র কৃষক, কারিগর ও নিন্মবর্গের মানুষরা সামাজিক নিপীড়িত ও অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন। উচ্চবর্নের শোষনে জর্জরিত এই অবহেলিত নিন্মবর্গীয় মানুষরা ভক্তি আন্দোলনের মধ্যে তাদের মুক্তির স্বাদ খুঁজে পেয়েছিলো। এইকারনে অধ্যাপক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য যথার্থই লিখেছেন, "শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অবদমিত নীচুতলার মানুষের জমে থাকা ক্ষোভই মধ্যযুগের সংস্কারমূলক বা বৈপ্লবিক ধর্মীয় আন্দোলন গুলির মূল কারন ছিলো।" 

ত্রয়োদশ - চতুর্দশ শতকে তুর্কি শাসকদের হাত ধরে ভারতে নতুন নতুন শহরের পত্তন হয়। এইসব শহুরে নতুন কারিগরি ও বনিক শ্রেনীর উত্থান ঘটে। পাঞ্জাবে ক্ষেত্রীদের মতো বনিকগোষ্ঠী নগরগুলির উত্থানে অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী হয়ে ওঠে। এইসব কারিগরি, বনিক শ্রেনী গুলি ভক্তিবাদী আন্দোলনে শুধু আকৃষ্টই হন নি এবং এই আন্দোলনের সমর্থনও জুগিয়ে যান। ভক্তিবাদের সাম্যবাদী মতাদর্শ কৃষক - কারিগর ও বনিক শ্রেনীর হীনম্মন্যতা কাটিয়ে তুলতে অনেকখানি সাহায্য করেছিলো।


Post a Comment (0)
Previous Post Next Post